অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদে বহাল হাসিনার আমলের তিন সচিব, সক্রিয় পুরোনো প্রভাববলয়

ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলেও এবং তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও তার অনুগত আমলাদের গ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারেনি দেশের আর্থিক খাত। বিগত সরকারের আমলে এস আলম, সালমান এফ রহমানের মতো মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে দেশের আর্থিক খাত তুলে দিয়ে যারা ‘চোরতন্ত্র’ ও ‘লুটপাটতন্ত্র’ কায়েমের নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করেছিলেন, তারা এখন এই বিএনপি সরকারের আমলেও সরকারের আর্থিক বিভাগের শীর্ষ পদগুলোয় বহাল রয়েছেন। সরকারের আর্থিক খাতের তিনটি বিভাগ—অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব পদে আছেন যথাক্রমে ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, নাজমা মোবারেক এবং মোহাম্মদ শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। এই তিন কর্মকর্তাই ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ফ্যাসিজম ও লুটতন্ত্র কায়েমের সহযোগী এবং সুবিধাভোগী। ওই আমলেই এরা প্রশাসনের শীর্ষ পদ অর্থাৎ সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।

সর্বশেষ, ইতিমধ্যে অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামানকে চাকরির মেয়াদ শেষে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। দেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, সেই সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে জনগণের প্রত্যাশাতেও। বিএনপি সরকার জনগণের বিপুল সমর্থন ও আশা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।

পররাষ্ট্রনীতিতে নতুনত্বের ছোঁয়া ও সামাজিক নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মনে আশান্বিত ভাব তৈরি করেছে। তবে সার্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা—বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছরে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ঋণের নামে জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম, দুর্নীতির যে পর্বতসম ক্ষত তৈরি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি না হলে কেবল সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনা অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর চ্যালেঞ্জ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ—অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ—দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।

অভিযোগ উঠেছে, গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সাবেক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত একদল কর্মকর্তা ঘুরেফিরে অর্থ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো দখল করে রেখেছেন। এমনকি পর্দার আড়াল থেকে এখনো ফ্যাসিবাদের দোসর ও প্রভাবশালী চক্রটি অর্থ বিভাগ এবং দেশের আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও জোর গুঞ্জন রয়েছে।

২০১৫-১৬ সালে আব্দুর রউফ তালুকদার SEIP প্রজেক্টে কর্মরত থাকা অবস্থায়ই অর্থ মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে সচিব হওয়ার পর তিনি নিজের পছন্দসই কর্মকর্তাদের দিয়ে অর্থ বিভাগ সাজান। তিনি গভর্নর পদে যাওয়ার পর ৯ম বিসিএসের ফাতেমা ইয়াসমিন ও পরবর্তীতে ১৩তম ব্যাচের কাস্টমস ক্যাডারের খায়েরুজ্জামান মজুমদারকে অর্থসচিব বানানোর পেছনেও তাঁর ও সালমান এফ রহমানের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

এটা কারো অজানা নয়, শেখ হাসিনার ফ্যাসিজম ও লুটতন্ত্র কায়েমের অন্যতম কর্ণধার ছিলেন আব্দুর রউফ তালুকদার। অর্থসচিব এবং পরে গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা এতটা ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিলেন যে, তখনকার অর্থমন্ত্রীও তাঁর কাছে পাত্তা পেতেন না। সালমান-এস আলমের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে আর্থিক খাত পুরোটাই তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেই আব্দুর রউফ তালুকদারেরই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন খায়েরুজ্জামান মজুমদার, নাজমা মোবারেক ও মোহাম্মদ শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। তিনিই বিভিন্ন সময়ে এদেরকে শেখ হাসিনার কাছে নিয়ে যান এবং সচিব পদে পদোন্নতির ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে এরা শেখ হাসিনারও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। আর এই সচিবদের হাতেই বিএনপি সরকারের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে বিতর্ক উঠলেও সরকারের শীর্ষ মহল এদের বহাল রাখার ব্যাপারে অনড় রয়েছেন অদৃশ্য কারণে। মাঝে এদের বদলির আদেশ জারি হলেও সঙ্গে সঙ্গেই তা আবার স্থগিত হয়ে যায়। এসবের পেছনে সরকারের ভেতরকার হাসিনা-রউফ তালুকদার এজেন্টদের কলকাঠি কি না, সেই প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে আর্থিক খাতে এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য নেই। তারও পেছনে এসব সচিবদের সূক্ষ্ম নেতিবাচক ভূমিকা কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বর্তমানে প্রশ্ন উঠেছে; কর্মকর্তা কোন আমলে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন তা নিয়ে নয়, বরং কে কীভাবে নিয়োগ ও পদোন্নতি পেয়েছেন? সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার কী ভূমিকা ছিল এবং তারা অস্বাভাবিক কোনো সুবিধা নিয়েছেন কি না? সংবেদনশীল নথি বা তথ্য অননুমোদিতভাবে বাইরে সরবরাহ করার মতো গুরুতর কাজের সঙ্গে কেউ যুক্ত আছেন কি না? জাতীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কেবল বাজেটের গাণিতিক সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা ও ঋণ, ব্যাংকের তারল্য এবং নিত্যপণ্যের বাজারব্যবস্থা সবই পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই কাঠামোর ভেতরে অবস্থান করে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যদি তথ্য গোপন করে বা সিদ্ধান্তের অপব্যবহার করে, তবে তার সরাসরি মাশুল গুনতে হয় সাধারণ জনগণকে। প্রশাসনিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই স্বার্থান্বেষী বলয় দ্রুত না ভাঙলে তারা ভবিষ্যতে সরকারের জন্য আরও বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

হাসিনা-রউফ তালুকদার বলয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভেতরের নানা অভিযোগ

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য ও অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থ মন্ত্রণালয় ও আর্থিক খাতে পুরোনো প্রভাববলয় এখনো পুরোপুরি সক্রিয় রয়েছে। আর এটাই বর্তমান সরকারের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার (অর্থসচিব): অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সচিব পদে এখনো বহাল রয়েছেন মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, যাকে পতিত হাসিনা সরকার ২০২৩ সালের আগস্টে অর্থসচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। এর আগে ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পদায়ন করা হয়, এর আগে তিনি অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। শেখ হাসিনা এবং আব্দুর রউফ তালুকদারের অত্যন্ত আস্থাভাজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত তিনি।

মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত র‌্যাবের সাবেক এডিজি বর্তমানে কারান্তরীণ মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য ছিল বলে প্রচারিত আছে। রউফ তালুকদার ও সংশ্লিষ্ট ক্ষমতার কেন্দ্রে বড় অঙ্কের বিনিময়ে যোগাযোগ ঘটিয়ে তিনি অর্থসচিবের পদ লাভ করেন এবং রউফ তালুকদারের নির্দেশনায় অর্থ মন্ত্রণালয় পরিচালনা অব্যাহত রেখেছেন বলে মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। নাজমা মোবারেকের সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি অর্থ বিভাগ ও এফআইডিতে আওয়ামী ভাবাদর্শের কর্মকর্তাদের নিয়ে ৩-স্তরের বলয় তৈরি করেছেন, যাতে বদলি হলেও তাঁদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।

নাজমা মোবারেক: আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৩তম ব্যাচের একজন কর্মকর্তা। তৎকালীন কুখ্যাত গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৩ সালের জুনে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। তারও আগে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বদলি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পলাতক ব্যবসায়ী এস আলম এবং সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার নেপথ্য থেকে এ বিষয়ে ভূমিকা রাখেন বলে জানা যায়।

সম্প্রতি অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালক পদে ১০ম ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও ইরাকের সাবেক রাষ্ট্রদূত ফজলুল বারীকে নিয়োগ দেওয়ার পেছনে তাঁর মূল ভূমিকা ছিল বলে জানা গেছে। ফজলুল বারী বিগত সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এবং আব্দুর রউফ তালুকদারের মেয়াদকালেই ইরাকের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দীর্ঘ চার বছর দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, জনপ্রশাসনে যোগ্য ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন না নিয়ে বা মন্ত্রীকে যথাযথভাবে না জানিয়েই কৌশলগতভাবে এই ফাইল অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এফআইডি সচিব নাজমা মোবারক, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান ও আইএমইডি সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে এ কাজটি করেছেন। এই নিয়োগকে একটি ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে দেখে পরবর্তীতে আরও বড় পরিবর্তনের ছক আঁকা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অর্থ উপদেষ্টা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সাবেক সরকারের সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ প্রদান ও তদারকির অভাব প্রসঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাঠামোগত ভূমিকা পর্যালোচনা ও সমালোচনা করা হয়েছিল। এর অংশ হিসেবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগটি বিলুপ্ত করে আগের মতো অর্থ বিভাগের একটি অনুবিভাগে পরিণত করারও দাবি তোলেন। যদিও এ বিষয়টি পরে আর এগোয়নি। কিন্তু দেখা গেছে, নাজমা মোবারেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব পদে থেকে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান পদে নিয়োগ নিয়ে অনেক কেলেঙ্কারিকাণ্ড ঘটান তিনি। এস আলম, সালমান, রউফ তালুকদারদের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন এ এফ এম শাহীনুল ইসলাম নামে এমন একজনকে, যিনি এ-সংক্রান্ত নিয়োগ পরীক্ষায় অত্যন্ত খারাপভাবে ফেল করেছেন। তখনকার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মাধ্যমে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে এই নিয়োগের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। ইসলামী ব্যাংকসহ ব্যাংকপাড়ায় বারবার সংকট তৈরির পেছনেও নাজমা মোবারেকের ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে বেশ কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তার নিয়োগ বাতিল বা বদলির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থগিত বা ম্যানেজ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এসবের সঙ্গেও নাজমা মোবারেক জড়িত রয়েছেন।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৮০ বছরেরও বেশি বয়সী সৈয়দ নাসের বখতিয়ার আহমেদ। অভিযোগ রয়েছে, বয়স ও শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও গোপনীয় সুবিধা ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি পদ আঁকড়ে আছেন। বিভিন্ন পর্ষদ সভায় বর্তমান ও বিগত প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও উপদেষ্টাদের নিজের আত্মীয় বা সহপাঠী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন তিনি। তবে তাঁর চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকার পেছনে নেপথ্য থেকে ভূমিকা রাখছেন সচিব নাজমা মোবারেক।

মোহাম্মদ শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী: অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব পদে আছেন প্রশাসন ক্যাডারের ১১তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। আওয়ামী লীগ আমলে শেখ হাসিনার হাতে ২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর শাহ্‌রিয়ার সচিব পদে পদোন্নতি পান। এখন পর্যন্ত একই পদে বহাল আছেন। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে গত ২৪ মার্চ তাঁকে ইআরডির সচিব পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও রহস্যজনকভাবে আবার সঙ্গে সঙ্গে সেই বদলির আদেশ বাতিল হয়ে যায়। অথচ এই কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ আমলে সবচেয়ে বড় আওয়ামী ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর পিএস থাকাকালে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের ওপর চরম স্টিম রোলার চালিয়েছেন তিনি। প্রশাসনে পদোন্নতিতে নিজের হাতে ‘কচুকাটা’ করেছেন বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের নাম। এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।

২০১৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর “প্রশাসনের পদোন্নতিতে এবার কচুকাটা হয়েছে প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী তখন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের একান্ত সচিব (পিএস) পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শাহরিয়ার তখন এতটাই ক্ষমতাবান ছিলেন যে, এসএসবির সুপারিশকৃত নথিতেও ব্যাপক কাটাকাটি করেন। এ নিয়ে তৎকালীন এসএসবির সদস্যরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তৎকালীন জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের নির্দেশনাকেও তিনি খুব একটা আমলে নিতেন না।

২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর ১৩৩ জন যুগ্মসচিবকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ওই পদোন্নতির আগে এসএসবি (সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড) পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের একটি তালিকা চূড়ান্ত করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য সার-সংক্ষেপ তৈরি করে। প্রতিমন্ত্রী এবং মন্ত্রীর দপ্তর হয়েই সার-সংক্ষেপটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাওয়ার কথা। কিন্তু তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর পিএস মোহাম্মদ শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী নিয়মবহির্ভূতভাবে সেই ফাইলে হস্তক্ষেপ করেন। তিনি এতটাই ক্ষমতাবান ছিলেন যে, এসএসবির সুপারিশ করা চূড়ান্ত নথিটি নিজের ড্রয়ারে ১ মাস ২ দিন আটকে রাখেন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে। এতে ব্যাপক কাটছাঁট করেন। বিশেষ করে যারা বিএনপি ঘরানার বা অতিমাত্রায় সৎ ও নিরপেক্ষ ছিলেন, তাঁদেরকে তালিকা থেকে বাদ দিতে তিনি ‘কচুকাট’ নীতি অবলম্বন করেন। অথচ সেই মোহাম্মদ শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকীই এখন ইআরডির সচিব পদে বহাল।

মোহাম্মদ শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব পদে থাকাকালে বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। গণমাধ্যমেই এ নিয়ে একাধিক খবর প্রকাশিত হয়েছে। এটাকে ইআরডি সচিবের ব্যর্থতা, অদক্ষতা অথবা সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমান অক্ষ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠক: বর্তমানে অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, এফআইডি সচিব নাজমা মোবারেক এবং আইএমইডি সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী মিলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পদায়ন নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নূরকে পরবর্তী অর্থসচিব বানানোর পরিকল্পনা হিসেবে বাজেট-১ অধিশাখার অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউল আবেদীনের কক্ষে সাপ্তাহিক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলেও জানা যায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধিশাখায় এখনো প্রায় ৭৫% কর্মকর্তা পূর্ববর্তী ভাবাদর্শের। জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শের কিছু কর্মকর্তা থাকলেও তাঁরা কোণঠাসা ও অগুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন।

বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) যদিও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন, কিন্তু এই বিভাগটিকেও আর্থিক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মনিটরিং ও মূল্যায়নের দায়িত্বে এই বিভাগ। আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তা সিরাজুন নূর চৌধুরী (৬৩৬২)-কে যখন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই বিভাগের সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, এ নিয়ে তখন ব্যাপক প্রতিবাদ ওঠে।

আওয়ামী লীগ আমলের অন্যতম সুবিধাভোগী কর্মকর্তা এই সিরাজুন নূর। পদোন্নতিসহ সব সুবিধাই তিনি পেয়েছেন বিনা বাধায়। শেখ মুজিবের মাজার জিয়ারতকারী ও ব্যাচের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থাভাজন হওয়ায় বরাবর আকর্ষণীয় পদায়নে চাকরি করেছেন। স্বৈরাচারের আমলে বিশেষ সুবিধা পেতে গিয়ে ব্যাচমেটদের বলি দিতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে সবাইকে বলতেন। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরে বোল পাল্টে ফেলেন। দীর্ঘদিন অর্থ বিভাগে থেকে চাকরি করার সুবাদে আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তাদের ও মন্ত্রী-এমপিদের মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের প্রিয়ভাজন হওয়ায় তাঁর সমস্ত কুকীর্তির সঙ্গে জড়িত আছেন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে কীভাবে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনা যায়, সেইসব নীতি-নির্ধারণী মহলের সঙ্গে কাজ করেছেন। আইএমইডির সচিব পদে থেকে দুর্নীতিবাজ প্রকল্প পরিচালকদের সঙ্গে যোগসাজশে বিভিন্ন প্রকল্পের অনিয়ম ধামাচাপা দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এমনকি সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরীর অন্য অনৈতিক কার্যকলাপেরও অভিযোগ এসেছে।