চট্টগ্রামে রেলের জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হলেও থমকে আছে রেলের তদন্ত

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে প্রথম শ্রেণির ট্রেনের কোচে বেড-বেডিং ধোলাই ও ইস্ত্রি কাজের ৬৫ লাখ টাকার দরপত্র প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির ঘটনায় গঠিত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় পার হয়ে গেলেও তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি। সাত কর্মদিবস পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার (সিসিএম) দপ্তর থেকে কোনো প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, একটি প্রভাবশালী চক্র এই তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন দপ্তরে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২ জুলাই, যখন রেলওয়ের বিভাগীয় বাণিজ্যিক দপ্তর থেকে প্রথম শ্রেণির বেডিং ধোলাইয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে জমা পড়া পাঁচটি আবেদনের মধ্যে তিনটি শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বাদ পড়ে যায়। বাকি থাকা ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’ ৬২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা এবং ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ ৬৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার দরপত্র দাখিল করে। সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও ‘মদিনা শালকর’-এর আবেদন এসএলটি পদ্ধতির অজুহাতে বাতিল করে দেয় বাণিজ্যিক দপ্তর। ফলে অতিরিক্ত প্রায় তিন লাখ টাকা বেশি খরচ করে ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’-কে কাজটি দেওয়া হয়, যার সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন বাণিজ্যিক দপ্তরের জেটিআই এনামুল হক শিকদার।

পরবর্তীতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর দরপত্রে জালিয়াতির সুস্পষ্ট অভিযোগ এনে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’-এর স্বত্বাধিকারী মোশারফ হোসেন ভুইয়া। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। দরপত্রজয়ী ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’-এর দেওয়া ঠিকানায় (পশ্চিম মাদারবাড়ি, যুগিচাঁদ মসজিদ লেন ২ নম্বর গলি) গিয়ে দেখা যায়, সেখানে মূলত ‘ফ্রেশ ওয়াশ সেন্টার’ নামে একটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কে এম মামুন রাজা নামক এক ব্যক্তির কাছ থেকে জায়গাটি ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ওই ব্যবসা পরিচালনা করছেন বিষ্ণু পাল আকাশ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম স্টেশন কলোনির মিঠুন নামে এক ব্যক্তি দুই মাস আগে ওই ফ্রেশ ওয়াশ সেন্টারে চাকরি নেন। সেখানে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি মালিক বিষ্ণু পালকে ধোলাইয়ের কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে আড়াই লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। এরপর ওই ঠিকানা ব্যবহার করেই ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’-এর নামে একটি ভুয়া চুক্তিনামা এবং প্রয়োজনীয় জাল কাগজপত্র প্রস্তুত করে রেলের দরপত্রে অংশ নেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, জালিয়াতির মূল হোতা মিঠুন মূলত চট্টগ্রাম স্টেশন কলোনির আইস ফ্যাক্টরি রোডের পুলিশ ব্যারাকের পেছনে রেলের জমি দখল করে গড়ে ওঠা ‘ভাই ভাই শালকর’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। কাগজে-কলমে ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ কাজ পেলেও বাস্তবে ধোলাই ও ইস্ত্রির সমস্ত কাজ এই অবৈধ ‘ভাই ভাই শালকর’ হাসপাতালেই সম্পন্ন করা হয়। শাহ আমানত ও জান্নাত ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী শহীদ ওরফে ‘কানা শহীদ’ মূলত এ আর কনস্ট্রাকশনের নামে জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে এই পুরো কারসাজি ঘটিয়েছেন। এছাড়া নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ ফাতেমা বেগম নামক এক নারীর নামে পাবনা থেকে নিবন্ধিত হলেও পুরো চট্টগ্রাম সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করছেন এই শহীদ।

এদিকে কেলেঙ্কারির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তা মো. এনামুল হক সিকদারকে জুনিয়র ট্রাফিক ইন্সপেক্টর হিসেবে লাকসামে বদলি করা হয় এবং তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় মো. মহিউদ্দিন পাটোয়ারীকে। তবে বদলির আদেশে এনামুলকে অতিরিক্ত হিসেবে পোর্ট-চট্টগ্রামেও দায়িত্ব বহাল রাখার বিষয়টি রহস্যের জন্ম দিয়েছে। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও নিজস্ব কারখানার নিয়ম না মেনে রেলের জায়গা দখল করে ধোলাই কাজ করায় ‘ভাই ভাই লন্ড্রি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল করেছিলেন বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও)।

পুরো প্রক্রিয়া ও তদন্তের ধীরগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম জানান যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তের সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দেওয়া হয়েছে কি না, তা এই মুহূর্তে তার মনে নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।