
নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য সামাজিক সংগঠন মোরেলগঞ্জ কল্যাণ সমিতি ও মোরেলগঞ্জ ফাউন্ডেশন। কয়েক যুগ ধরে এই সংগঠনটি অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সংগঠনটিতে শত শত সম্মানিত সিনিয়র, আজীবন সদস্য ও সাধারণ সদস্য রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-নেত্রীরা সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তবে সম্প্রতি সংগঠনের নির্বাচন ও শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে সদস্যদের মধ্যে নানা প্রশ্ন, ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ সূত্রে একজন সিনিয়র সদস্যের মাধ্যমে জানা যায়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে কোনো যথাযথ নোটিশ, আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি কিংবা সিনিয়র সদস্যদের উদ্দেশ্যে দাওয়াতপত্র বা আমন্ত্রণপত্র প্রদান না করেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. মোহাম্মদ মশিউর রহমান নির্বাচন-পরবর্তী শপথ গ্রহণের কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সদস্যদের অভিযোগ, সংগঠনের শত শত আজীবন সদস্য ও সিনিয়র সদস্যকে যথাযথভাবে অবহিত না করে এবং তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়েই একটি সীমিত পরিসরে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এমনকি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন ও শপথ গ্রহণের পরিবর্তে মনগড়াভাবে নির্বাচিত বা মনোনীত হিসেবে ঘোষিত ফাউন্ডেশনের সদস্যদের শপথ পাঠ করানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সদস্য।
সদস্যদের প্রশ্ন, গঠনতন্ত্রে নির্ধারিত নিয়মনীতি অনুসরণ না করে এ ধরনের নির্বাচন ও শপথ গ্রহণ কতটুকু যুক্তিসঙ্গত এবং এর মাধ্যমে ঘোষিত নেতৃত্ব বা কমিটি কতটুকু সাংগঠনিক ও গঠনতান্ত্রিক ভিত্তি লাভ করেছে? এ নিয়ে এখন মোরেলগঞ্জ উপজেলা ও সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে।
সংগঠনের একাধিক সদস্যের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সিনিয়র ও আজীবন সদস্যদের যথাযথভাবে অবহিত না করে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করায় দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এই সামাজিক সংগঠনের ভাবমূর্তি ও সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে বিগত দিনের বিভিন্ন প্রার্থীর মনোনয়নপত্রের টাকা ও অন্যান্য আর্থিক বিষয়ের হিসাব-নিকাশ নিয়েও সমস্যা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সদস্য। তাদের দাবি, পূর্বের এসব সমস্যার সমাধান না করে এবং সংগঠনের আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়গুলো পরিষ্কার না করেই নতুন করে নির্বাচন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সংগঠনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা ড. মোহাম্মদ মশিউর রহমানকে দীর্ঘদিন ধরে একজন ভালো মানুষ হিসেবে জানতেন। কিন্তু সিনিয়র সদস্যদের যথাযথভাবে না জানিয়ে এবং গঠনতন্ত্রের বিধিবিধান স্পষ্টভাবে অনুসরণ না করে নির্বাচন ও শপথ গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে তা একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের মান-সম্মান ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
এদিকে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, ইতোমধ্যে কয়েকজন ভালো ও সম্মানিত ব্যক্তি ড. মোহাম্মদ মশিউর রহমানের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘদিনের অবদানের ভিত্তিতে অনেক ভালো ও সম্মানিত মানুষকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। এ কারণে সংগঠনের কিছু সম্মানিত সদস্য তার কাছ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলেও তারা জানান।
কয়েকজন সদস্য আরও অভিযোগ করে বলেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন ও সমাজের জন্য কাজ করে আসছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে ড. মোহাম্মদ মশিউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে তাদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। তাদের ভাষ্য, ভালো ও যোগ্য ব্যক্তিদের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের অবদানকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করেননি।
একাধিক সদস্যের ভাষায়, ভালো মানুষদের মূল্যায়ন না করা এবং তাদের পাশে না দাঁড়ানোর কারণে অনেক সম্মানিত ব্যক্তি বর্তমানে তার কাছ থেকে দূরে সরে গেছেন। তাদের আরও অভিযোগ, ভালো ও যোগ্য ব্যক্তিদের কল্যাণে কিংবা প্রয়োজনে ড. মোহাম্মদ মশিউর রহমানের পক্ষ থেকে তারা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি।
তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সদস্যদের অভিযোগ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে বলে তারা জানান।
অভিযোগ রয়েছে, মোরেলগঞ্জ কল্যাণ সমিতি ও ফাউন্ডেশনের স্থায়ী অফিস প্রীতম জামাল টাওয়ার, কালভার্ট রোড, জামান ভবন-এ অবস্থিত এবং সেখানে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অফিস রয়েছে। কিন্তু ওই স্থানে নির্বাচন-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা না করে বিয়াম ভবনে ড. মশিউর রহমানের নিয়ন্ত্রণাধীন কার্যালয়ে সংগঠনের নেতা-কর্মীদের শপথ পাঠ করব হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সদস্যরা।
সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিয়াম ভবনে ফাউন্ডেশনের সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংগঠনের নির্বাচন ও শপথ গ্রহণের ক্ষেত্রে কেন স্থায়ী কার্যালয়ে সদস্যদের উপস্থিতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করা হলো না—এ প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
সংগঠনের বিভিন্ন মহলের সদস্যরা আরও বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সব আজীবন সদস্য, সাধারণ সদস্য এবং সিনিয়র সদস্যের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত ছিল। তাদের মতে, গঠনতন্ত্রের বিধান ও সদস্যদের অধিকার নিশ্চিত না করে নির্বাচন ও শপথ গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে সংগঠনের মধ্যে বিভাজন ও বিরোধ আরও বাড়তে পারে।
এদিকে ড. মোহাম্মদ মশিউর রহমানের পদবি ব্যবহার নিয়েও কয়েকজন সম্মানিত সদস্য প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, ড. মশিউর রহমান বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন; কিন্তু কোথাও কোথাও তাকে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার পরিচয়ে উল্লেখ করা হচ্ছে। এ ধরনের পদবি ব্যবহারের কারণ ও ভিত্তি কী—তা নিয়েও সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সদস্যদের অভিযোগ, একটি অরাজনৈতিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত মোরেলগঞ্জ কল্যাণ সমিতি ও ফাউন্ডেশন বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি ও পদ-পদবি গ্রহণের প্রবণতায় অনেকটাই প্রভাবিত হচ্ছে। একটি অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা কেন বাড়ছে—এ প্রশ্নও তুলেছেন কয়েকজন সদস্য।
তাদের ভাষ্য, সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মোরেলগঞ্জের মানুষের কল্যাণ, পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা। কিন্তু পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত সংগঠনের মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলে তারা মনে করেন।
কয়েকজন সম্মানিত সদস্য আরও অভিযোগ করেন, ড. মোহাম্মদ মশিউর রহমান জুনিয়র ও অপেক্ষাকৃত কম বয়সী সদস্যদের যথাযথ মূল্যায়ন করেন না। তাদের অভিযোগ, অনেক ভালো ও যোগ্য মানুষকেও তিনি প্রাপ্য সম্মান দিতে জানেন না। ফলে যোগ্য ও ভালো মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে।
সংগঠনের একাধিক সদস্যের দাবি, ইতোমধ্যে এমন পরিস্থিতির কারণে অনেক ভালো মানুষ তার কাছ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। তারা মনে করেন, দীর্ঘদিন সংগঠনের সঙ্গে থাকা অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা হলে সংগঠন আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হতে পারত।
কয়েকজন সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা ড. মশিউর রহমানকে একজন সরল, ভালো মনের মানুষ হিসেবেই জানতেন। কিন্তু বর্তমানে তার কিছু সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম তাদের হতাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, তার নেতৃত্বে গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সিনিয়র সদস্যদের মতামত এবং যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়নের বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। তারা আরো মনে করেন ড. মশিউর রহমান তিনিই একজন সর্বোচ্চ স্থানে মানুষ-
সদস্যদের কেউ কেউ আরও বলেন, একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে ড. মশিউর রহমানের কাছ থেকে তারা আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গঠনতন্ত্রসম্মত ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচন ও শপথ গ্রহণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের সেই প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে ড. মোহাম্মদ মশিউর রহমান একটি প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন বলেও সদস্যরা উল্লেখ করেন। তাদের বক্তব্য, একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে তার কাছ থেকে সংগঠনের সব পক্ষের সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে, সিনিয়রদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এবং গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রত্যাশা রয়েছে।
এদিকে মোরেলগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে বর্তমানে নির্বাচন ও শপথ গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার আলোচনা চলছে। সংগঠনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সুনাম ও মর্যাদা যাতে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়, সে জন্য বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সদস্যরা।
তাদের প্রশ্ন—গঠনতন্ত্রের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করে, শত শত আজীবন ও সিনিয়র সদস্যকে যথাযথভাবে অবহিত না করে এবং তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত রেখে নির্বাচন ও শপথ গ্রহণ করা হলে সেটি কতটুকু গ্রহণযোগ্য?
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. মোহাম্মদ মশিউর রহমানের মুঠোফোনে বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। নির্বাচন প্রক্রিয়া, শপথ গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট কমিটি বা সদস্যদের গঠনতান্ত্রিক অবস্থান নির্ধারণের জন্য সংগঠনের গঠনতন্ত্র, নোটিশ, নির্বাচন-সংক্রান্ত নথি, সদস্য তালিকা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
মোরেলগঞ্জ কল্যাণ সমিতি ও ফাউন্ডেশনের কয়েক যুগের ঐতিহ্য, সম্মান ও সাংগঠনিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গঠনতন্ত্রের যথাযথ অনুসরণ এবং সব শ্রেণির সদস্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংগঠনের একাধিক সদস্য।
তাদের প্রত্যাশা, উদ্ভূত প্রশ্নগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া হবে এবং সংগঠনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে সিনিয়র, আজীবন ও সাধারণ সদস্যদের মতামত ও অধিকারকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হবে।















