চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা

সাশ্রয়ী ও নিরাপদ গণপরিবহনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের হওয়া একটি অভিযোগ এবং বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ নথি এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত—মাত্র তিন বছরে শুধু চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতেই ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকারও বেশি অর্থের অপচয়, ক্ষতি ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ভুয়া বিল তৈরি, জ্বালানি ও ফেরি খরচে কারচুপি, অগ্রিম ভাতা ও ভ্রমণ-দৈনিক ভাতা (টিএ/ডিএ) আত্মসাৎ এবং হিসাব জালিয়াতির মতো বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

দুদকে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর রাজস্ব আদায়, জ্বালানি ও অন্যান্য নির্ধারিত খাতে ব্যয় দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। অভিযোগকারী বিআরটিসির কেন্দ্রীয় স্টোর অফিসার মো. মোস্তাকিজুর রহমানের দাবি অনুযায়ী, জ্বালানি, গ্যারেজ, টুলস ও ফেরি খরচ এবং বিভিন্ন ধরনের ভাতার নামে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ অর্থ তুলে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে ৪৩০ পাতারও বেশি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগে চিহ্নিত ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম মো. মফিজ উদ্দিন। তিনি ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ইউনিট প্রধান (ম্যানেজার অপারেশন) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন এবং বর্তমানে জোয়ারসাহারা বাস ডিপো থেকে বদলি হয়ে প্রধান কার্যালয়ে অপারেশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। এর আগেও জোয়ারসাহারা ডিপোতে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছিল বলে জানা যায়। দ্বিতীয় অভিযুক্ত মো. কামরুজ্জামান, যিনি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত একই ডিপোতে সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং বর্তমানেও একই প্রতিষ্ঠানে আছেন। অভিযোগে দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাশিয়ার মো. আ. করিম এবং হিসাব কর্মকর্তা মো. রমজান হোসেনের নামও উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারী এদের সবার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও দুদকের অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন।

বিআরটিসির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ চালু আছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের একাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মো. মফিজ উদ্দিন চট্টগ্রামের তৎকালীন এক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে লাভজনক ডিপোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে যে তিনি সাবেক এক সংসদ সদস্যের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় পরিচয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে পদায়ন পেয়েছিলেন। সম্প্রতি তাকে খুলনা বাস ডিপোতে পদায়ন করা নিয়েও প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ডিপো ও ইউনিটে পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত না হলেও বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ নথি ও দুদকে জমা পড়া অভিযোগে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর আর্থিক অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট বলে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, প্রতিষ্ঠানে ফ্যাসিস্ট আমলের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে শিগগির বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে মেধা উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি ও লেনদেনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শামিল, যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জনগণের আস্থা—উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পরিবহন খাতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সিন্ডিকেটই অনিয়মের মূল কারণ, এবং প্রাইভেট বাস খাতে বছরে অন্তত এক হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি ও ঘুষ লেনদেন হয় বলে সংস্থাটির গবেষণায় উঠে এসেছে।

অভিযুক্ত মো. মফিজ উদ্দিন ও মো. কামরুজ্জামানের প্রতিক্রিয়া জানতে একাধিকবার তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি বলে জানা গেছে, ফলে তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতার পালাবদলের পরও পুরোনো সিন্ডিকেট বহাল থাকলে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাদের মতে, দুদক ও বিভাগীয় তদন্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি—যাতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়।