
এক কোটি আশি লাখ টাকার মেহগনি বাগান, শত বিঘার ওপর স্থাবর সম্পত্তি, বিশাল ডেইরি ফার্ম, সঙ্গে অন্তত ১০ কেজি স্বর্ণ চোরাচালানের সমঝোতা—কোনো রূপকথা নয়, মাত্র এক দশকের চাকরি জীবনে এই বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক বনে গেছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। তার নাম শহিদুল ইসলাম (কাঁকন)। সরকারি এই কর্মকর্তার কয়েক বছরের চাকরি জীবনের ব্যবধানে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।
মসলা বিক্রেতার ঘরে জন্ম, আওয়ামী আমলে এনবিআরে চাকরি
অনুসন্ধানে জানা যায়, নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার শ্রীরামগাতি গ্রামের বাসিন্দা মহির উদ্দিনের একমাত্র ছেলে শহিদুল ইসলাম কাঁকন। এলাকার প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মহির উদ্দিন স্থানীয় হাট-বাজারে ধনিয়া, জিরা, আদা, হলুদ, মরিচের মতো মসলা জাতীয় পণ্য ফেরি করে বিক্রি করতেন। অভাব-অনটনের মাঝেও দুই কন্যা ও একমাত্র ছেলেকে কোনোমতে লেখাপড়া করান তিনি।
১২-১৩ বছর আগে তৎকালীন স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চাকরি হয় শহিদুলের। এর পর থেকেই নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে থাকে এই পরিবারের দৃশ্যপট। পদ-পদবীতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হলেও, এনবিআরে দ্রুতই এক ক্ষমতাধর কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন শহিদুল।
গ্রামে সম্পদের পাহাড়, কোটি টাকার মেহগনি বাগান
শ্রীরামগাতি গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে শহিদুলের অঢেল সম্পদের সত্যতা পাওয়া গেছে। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে তিনি এলাকায় প্রায় শত বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। গড়ে তুলেছেন এক বিশাল ডেইরি ফার্ম। এছাড়া বাড়ির পাশেই জমিসহ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা দিয়ে কিনেছেন মেহগনি গাছের বিশাল বাগান। তৈরি করেছেন চোখ ধাঁধানো বিলাসবহুল বাড়ি। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকাতেও তার রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট ও গাড়ি, যার অনুসন্ধান এখনো চলছে।
১০ কেজি স্বর্ণ চোরাচালান ও ‘ম্যানেজ’ করার দম্ভ
অনুসন্ধানে শহিদুলের এই আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার পেছনে আরও ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন বন্দরে দায়িত্ব পালনকালে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রের সাথে তার বিশেষ সখ্যতা গড়ে ওঠে। মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে চোরাচালানের পণ্য নিরাপদে পারাপারে সহযোগিতা করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের এক মুরুব্বি জানান, শহিদুল একবার ১০ কেজি স্বর্ণ চোরাচালানে সহযোগিতা করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন। কিন্তু বিভাগীয় ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার বদলে তিনি এলাকায় এসে গর্ব করে বলতেন, “১০ কেজি স্বর্ণসহ ধরা খাইছি তো কী হইছে? ২ কেজি স্বর্ণ বিক্রির টাকা দিয়ে সব ম্যানেজ করে ফেলছি, বাকি ৮ কেজি তো আমার কাছেই আছে।”
অভিযোগ অস্বীকার ও সাংবাদিকদের চাপ প্রয়োগ
এসব গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানী দল শহিদুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে রাজশাহীতে তার বর্তমান কর্মস্থলে গিয়ে যোগাযোগ করা হলে, তিনি প্রথমে নিজের পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেন।
একপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও ছবি দেখানো হলে তিনি অবৈধ উপার্জনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এগুলো আমার সম্পদ না, আমার পরিবারের সম্পত্তি।” তবে তার বাবার অতীত অসচ্ছলতা এবং একজন সরকারি কর্মকর্তার পরিবারের পক্ষে এত দ্রুত শত বিঘা জমির মালিক হওয়ার উৎস জানতে চাইলে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পদে ছোট হলেও শহিদুল ইসলামের প্রভাবের হাত যে অনেক লম্বা, তার প্রমাণ মেলে অনুসন্ধানের শেষ মুহূর্তে। রাজশাহীতে তার অফিস থেকে অনুসন্ধানী দল বের হওয়ার কয়েক মিনিটের মাথায় ঢাকা থেকে একাধিক প্রভাবশালী সাংবাদিক নেতা শহিদুলের পক্ষ নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার জন্য নানামুখী চাপ ও তদবির শুরু করেন।















