
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ করতে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান নানামুখী চেষ্টা চালালেও, আইনের ফাঁকফোকর ও সফটওয়্যারের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পকেট ভারী করছেন একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা। এবার বিআরটিএর যশোর সার্কেলে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. নাহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে সরকারের লাখ লাখ টাকার রাজস্ব গচ্চা দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। অবাক করার বিষয় হলো, বিগত ৬ মাসে এই সার্কেলে ব্যাপক অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও গত ১৬ জুন বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন (পিএসসি) সচিবালয়ের এক স্মারকে তাকে সহকারী পরিচালক (সাধারণ) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ‘খানা জরিপ ২০২৫’ অনুযায়ী, বিআরটিএতে দুর্নীতির হার ৭৯.৩% এবং ঘুষের হার ৬৩.৫%। সেবা খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা এই সংস্থায় কীভাবে রাজস্ব লোপাট হচ্ছে, তার একটি বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে যশোর সার্কেলের অনুসন্ধানে।
যশোর সার্কেলের এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী কম্পিউটার অপারেটর রফিকুল ইসলাম ওরফে রফিক। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, রফিক বিআরটিএর কোনো বৈধ কর্মচারী নন। তা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে তিনি এই সার্কেলের কম্পিউটার অপারেটরের কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন। অফিসের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর অফিশিয়াল আইডি ও পাসওয়ার্ড থাকে এই রফিকের কাছে। অনলাইন সংক্রান্ত সব কাজ এবং ঘুষের লেনদেন মূলত এই রফিকের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। প্রতি ফাইলে ৫ হাজার টাকা করে ঘুষের বিনিময়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে ফাইল ছাড় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩ সাল থেকে সরকার মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন ফি বর্ধিত করে ১১,৭৬৪ টাকা নির্ধারণ করে (যার মধ্যে ডিজিটাল নম্বর প্লেট, নিউ রেজিস্ট্রেশন, সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, ট্যাক্স টোকেন, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড এবং ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট ফি অন্তর্ভুক্ত)। এর পূর্বে এই ফি ছিল ১০,১৫২ টাকা।
নাহিদুজ্জামান ও রফিক সিন্ডিকেট সফটওয়্যারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ২০২৩ সালের পূর্বের জমাকৃত ১০,১৫২ টাকার স্লিপ দিয়ে ২০২৬ সালেও মোটরসাইকেল নিবন্ধন দিয়েছেন। সরকারের বর্ধিত অতিরিক্ত ১,৬১২ টাকা ফি আদায় না করেই শতাধিক মোটরসাইকেলকে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারের প্রায় ১,৬১,২০০ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
প্রমাণিত ২২টি মোটরসাইকেলের নম্বর:
যশোর-ল-১৭-৫২৫৪, যশোর-ল-১৭-৩২৮০, যশোর-ল-১৭-৩২৭৬, যশোর-ল-১৭-৫৮২১, যশোর-ল-১৭-৫৮০১, যশোর-ল-১৭-৫৭৯০, যশোর-ল-১৭-৫৫৮৫, যশোর-ল-১৭-৩২২ pack০, যশোর-ল-১৭-৩১৮৭, যশোর-ল-১৭-৩১৮৪, যশোর-ল-১৭-৩৪৫৩, যশোর-ল-১৭- can৪৩৭, যশোর-ল-১৭-৩৪২৬, যশোর-ল-১৭-৩৪২৫, যশোর-ল-১৭-৩৩২৬, যশোর-ল-১৭-৩৫৩০, যশোর-ল-১৭-৫১৯৬, যশোর-ল-১৭-৫১৯৫, যশোর-ল-১৭-৫১৭৫, যশোর-ল-১৭-৪১২০, যশোর-ল-১৭-৩৯৪০, যশোর-ল-১৭-৩৮৫৭।
সবচেয়ে বড় জালিয়াতি করা হয়েছে মোটরসাইকেলের মূল মালিকানা পরিবর্তনের ফি ফাঁকি দিয়ে। একটি নির্দিষ্ট চ্যাসিসের (যেমন: Chassis no- MD624HC16H2K86252) বিপরীতে ২০১৮ সালে ব্যাংক ফি জমা দিয়েছিলেন মো. বেলাল হোসেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর সেই চ্যাসিসের গাড়িটি গোলাম রাসেল নামে অন্য এক ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রেশন (যশোর-ল-১৭-৩০৫০) দেওয়া হয়।
আইন অনুযায়ী, ফি জমাদানকারী ও আবেদনকারী এক না হলে প্রথমে প্রথম ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রেশন করে মালিকানা পরিবর্তন করতে হবে, অথবা প্রয়োজনীয় হলফনামা ও ফি জমা নিয়ে ২য় ব্যক্তির নামে সরাসরি নিবন্ধন দিতে হবে। বিআরটিএর তথ্যমতে, এই মালিকানা পরিবর্তনের জন্য ট্রান্সফার ফি, পরিদর্শন ফি, ভ্যাট, ডুপ্লিকেট ও ডিজিটাল সার্টিফিকেট ফিসহ মোট ৪,৮৪০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
নাহিদুজ্জামান ও রফিকের সিন্ডিকেট ৫ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে কোনো প্রকার মালিকানা পরিবর্তন ফি ও ৩টি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প (মূল্য ৮০০ টাকা) ছাড়াই সরাসরি ভিন্ন ব্যক্তির নামে মোট ৫০টি মোটরসাইকেল নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে।
মালিকানা ফি বাবদ রাজস্ব ক্ষতি: ৫০টি × ৪,৮৪০ টাকা = ২,৪২,০০০ টাকা
স্ট্যাম্প বাবদ রাজস্ব ক্ষতি: ৫০টি × ৮০০ টাকা = ৪০,০০০ টাকা
মোট রাজস্ব ক্ষতি (এই খাতে): ২,৮২,০০০ টাকা
চিহ্নিত ৫০টি জালিয়াতিপূর্ণ রেজিস্ট্রেশন নম্বর:
যশোর-হ-২২-৬২৩৩, যশোর-ল-১৭-৩০৫০, যশোর-ল-১৭-৫১৯৭, যশোর-ল-১৭-৩৮৬৭, যশোর-ল-১৭-৩৮৯৪, যশোর-ল-১৭-৪০১৮, যশোর-ল-১৭-৪০২৯, যশোর-ল-১৭-৫১৮০, যশোর-ল-১৭-৩৫০৫, যশোর-ল-১৭-৩৫৯৩, যশোর-ল-১৭-৩৬২৪, যশোর-ল-১৭-৩৭৩০, যশোর-ল-১৭-৩৩৮৫, যশোর-ল-১৭-৩৪৬৮, যশোর-ল-১৭-৩৪৬৯, যশোর-ল-১৭-৩৪৭১, যশোর-ল-১৭-৩১০১, যশোর-ল-১৭-৩১৬২, যশোর-ল-১৭-৩২০৬, যশোর-ল-১৭-৩২২১, যশোর-ল-১৭-৩২৭২, যশোর-ল-১৭-৩২৭৪, যশোর-ল-১৭-৩২৭৫, যশোর-ল-১৭-৫২৫৯, যশোর-ল-১৭-৫২৬৮, যশোর-ল-১৭-৫২৭০, যশোর-ল-১৭-৫২৭৬, যশোর-ল-১৭-৫৫৮৪, যশোর-ল-১৭-৫১৯ \৮, যশোর-ল-১৭-৫১৯৯, যশোর-ল-১৭-৫২১৭, যশোর-ল-১৭-৫২৫৪, যশোর-ল-১৭-৩২৮০, যশোর-ল-১৭-৩২৭৬, যশোর-ল-১৭-৫৮২১, যশোর-ল-১৭-৫৮০১, যশোর-ল-১৭-৫৫৮৫, যশোর-ল-১৭-৩২২০, যশোর-ল-১৭-৩১৮৭, যশোর-ল-১৭-৩১৮৪, যশোর-ল-১৭- can৪৩৭, যশোর-ল-১৭-৩৪২৫, যশোর-ল-১৭-৩৩২৬, যশোর-ল-১৭-৫১৯৬, যশোর-ল-১৭-৫১৯৫, যশোর-ল-১৭-৫১৭৫, যশোর-ল-১৭-৪১২০, যশোর-ল-১৭-৩৯৪০, যশোর-ল-১৭-৩৮৫৭।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর একজন পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) জানান, আবেদন গ্রহণের দিন নির্ধারিত সরকারি ফি এবং নামের অমিল থাকলে মালিকানা বদল ফি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এর ব্যতিক্রম সরাসরি “সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ” হিসেবে গণ্য হবে।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮: এই জালিয়াতি ‘Negligence in official duty’ বা সরকারি দায়িত্বে অবহেলা ও অসদাচরণ। এর শাস্তি হিসেবে সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা, ইনক্রিমেন্ট স্থগিত, পদাবনতি কিংবা চাকরিচ্যুতি হতে পারে।
দুদক আইন ২০০৪ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭: ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তি বা ডিলারকে অবৈধ সুবিধা দেওয়া এবং জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলস (GFR) লঙ্ঘন করায় এটি ফৌজদারি অপরাধ। তদন্ত সাপেক্ষে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের মামলা দায়ের করতে পারে।
ছাত্র-জনতার ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ের মুখে বিআরটিএর এমন বেপরোয়া দুর্নীতি ও অভিযুক্ত কর্মকর্তার তড়িঘড়ি পদোন্নতি সংস্থাটির ভেতরের শুদ্ধি অভিযানকেই বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।















