প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচার কি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি?

ঢাকার প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ন্যায়বিচারের প্রতি সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আস্থাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো এক উদ্বেগজনক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীরা যখন নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ের শেষ আশ্রয় হিসেবে আদালতের দ্বারস্থ হন, তখন তারা আশা করেন একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়া। কিন্তু অভিযোগ উঠছে—এই প্রক্রিয়ার ভেতরেই অদৃশ্য এক সিন্ডিকেট সক্রিয়, যা অনেক ক্ষেত্রে মামলার গতি ও ফলাফল প্রভাবিত করছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, মামলার তারিখ নির্ধারণ এখন আর শুধুই বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়; বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মিত লেনদেনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কেউ দ্রুত শুনানির সুযোগ পাচ্ছেন, আর যারা তা করতে পারছেন না, তারা বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকছেন। এতে করে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে কিছু তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর ভূমিকা। অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত থেকে তারা একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেছেন। যেখানে বিচারক বা ম্যাজিস্ট্রেটরা নির্দিষ্ট সময় পরপর বদলি হন, সেখানে এসব কর্মচারী বছরের পর বছর একই দায়িত্বে থেকে পুরো কার্যক্রমে অঘোষিত প্রভাব বিস্তার করছেন।

ফলে বিচারপ্রার্থী অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী পড়ছেন দ্বিমুখী চাপে—একদিকে আইনি লড়াই, অন্যদিকে প্রশাসনিক জটিলতার নামে হয়রানি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, অনেক ক্ষেত্রে এসব কর্মচারীদের প্রভাব এতটাই বেশি যে তারা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতিও তোয়াক্কা করেন না।

একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, “ন্যায়বিচার শুধু একটি রায় নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে পুরো বিচারব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি কেবল ব্যক্তিগত অনিয়মের অভিযোগ নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। জবাবদিহিতার অভাব, স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং নিয়মিত রদবদলের অনুপস্থিতি মিলেই এমন পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কারণ, বিচার কেবল একটি রায় নয়—এটি একটি বিশ্বাসের নাম। আর সেই বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে, তা পুনর্গঠন করা সবচেয়ে কঠিন কাজ।