রাজউকের কম্পিউটার অপারেটরের ৫০ কোটির সম্পদ

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকার পরিকল্পিত নগরায়ণ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, সরকারি কাজে প্রভাব বিস্তার, স্বজনতোষণ, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রাজউকের জোন-৫ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর প্রকল্প দপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর (অতিরিক্ত দায়িত্বে উচ্চমান সহকারী) ফাতেমা বেগম মলি এবং এস্টেট ও ভূমি-২ শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর জাহিদুল ইসলাম সবুজ।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই ধরনের দায়িত্বে থাকার সুযোগে তারা দাপ্তরিক কাজে প্রভাব বিস্তার করেছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ফাইল, ঠিকাদারদের বিল, চুক্তি সম্পাদন, বোর্ড সভার কার্যপত্র, ভবন নির্মাণের নকশা এবং এস্টেট ও ভূমি-সংক্রান্ত নথি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

ফাইল আটকে ঘুষ দাবির অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলন, ঠিকাদারি চুক্তি, রানিং ও ফাইনাল বিলসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি ফাতেমা বেগম মলির টেবিল হয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে যেত। অভিযোগকারীদের দাবি, ঘুষের বিনিময়ে ফাইল দ্রুত ছাড় করা হলেও অর্থ না দিলে নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হতো।

এমনকি কাজের বাস্তব অগ্রগতি যথাযথভাবে যাচাই না করেই কোনো কোনো ঠিকাদারের বিল ছাড় করার অভিযোগও রয়েছে। এর ফলে নিম্নমানের বা অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে সরকারি অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

ফাতেমা বেগম মলির বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো স্বামীর মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে রাজউকের বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দেওয়া।

অভিযোগে বলা হয়েছে, তাঁর স্বামী আবুল ফজল রাজুর মালিকানাধীন ‘রাজু ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘রাজু প্রপার্টিজ অ্যান্ড ডেভেলপারস’ নামের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজউকের কাজের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দরপত্র আহ্বানের আগে কাজের তথ্য জানানো এবং দরপত্রের শর্ত নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুবিধামতো তৈরির অভিযোগও করেছেন অভিযোগকারীরা।

এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া ও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কার্যাদেশ, দরপত্র নথি ও অর্থ পরিশোধের তথ্য যাচাই প্রয়োজন।

রাজউকের এস্টেট ও ভূমি-২ শাখার কর্মচারী জাহিদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধেও ঘুষ ও নথি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, রাজউক ভবনের ৪২১ নম্বর কক্ষে ক্ষতিপূরণের ফাইল, প্লট বরাদ্দপত্র, নামজারি ও মালিকানা পরিবর্তনসংক্রান্ত নথি নিয়ে অবৈধ লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।

একই প্লট একাধিক ব্যক্তির নামে বরাদ্দ, মালিকানাসংক্রান্ত নথিতে পরিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র গায়েবের মতো গুরুতর অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথির পূর্ণাঙ্গ যাচাই বা কোনো তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি।

অভিযোগে ফাতেমা বেগম মলির নামে রাজধানীর ধানমন্ডি ও ঝিগাতলা এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট এবং পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে একাধিক প্লট থাকার দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমিজমা ও একটি নোয়া মাইক্রোবাসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীরা এসব সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা বলে দাবি করেছেন।

অন্যদিকে জাহিদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধে রাজধানীর সবুজবাগে অ্যাপার্টমেন্ট, দক্ষিণ মাদারটেকে নির্মাণাধীন ভবনে অংশীদারিত্ব, গাজীপুরের একটি রিসোর্টে বিনিয়োগ এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ও জমি থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব সম্পদের মালিকানা, প্রকৃত মূল্য ও অর্থের উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই না করে এগুলোকে অবৈধ সম্পদ হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করা যায় না।

অভিযোগের নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর ঠিকাদার মেহেদী হাসান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফাতেমা বেগম মলির বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, ঝিগাতলার ফ্ল্যাট ও পূর্বাচলের প্লটসহ বিভিন্ন বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।

এ ছাড়া ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর ও ২০২৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাহিদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয়ে দীর্ঘ সময় পার হলেও কার্যকর নিষ্পত্তি হয়নি।

লেখায় দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শাহআলী থানায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় ফাতেমা বেগম মলি ও তাঁর স্বামীর নাম এজাহারে রয়েছে। এ কারণে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত না করা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

তবে কোনো মামলায় আসামি হওয়া নিজেই অপরাধ প্রমাণ করে না; অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে জাহিদুল ইসলাম সবুজ বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করেন, রাজউকে তিনি সততার সঙ্গে চাকরি করছেন এবং দাপ্তরিক কোনো কাজের বিনিময়ে কারও কাছ থেকে ঘুষ নেননি।

তাঁর ভাষ্য, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁকে হেয় করা এবং চাকরি থেকে সরানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সংস্থায় ভিত্তিহীন অভিযোগ করছে।

ফাতেমা বেগম মলির বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজউকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হয়। কোনো ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায় না বলেও তারা জানান।

তাদের দাবি, উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে চাকরিবিধি ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজউকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সরকারি নথি ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি কাজ, ভূমি ও প্লটসংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তই এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, সম্পদের উৎস, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং দাপ্তরিক সিদ্ধান্তগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।