
বাংলাদেশ রেলওয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু এবং সিডিআরপির (CDRP) মতো মেগা প্রকল্পে দরপত্র মূল্যায়ন, চুক্তি বাস্তবায়ন ও অর্থ পরিশোধে অনিয়মের পাশাপাশি রেলের জমি দখলেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট নথি ও অডিট আপত্তিতে সরকারের কয়েক হাজার কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগগুলো এখনো প্রমাণিত হয়নি।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে যমুনা রেলসেতু প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
যমুনা রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পে অডিট বিভাগের বিশেষ নিরীক্ষায় ৩৪টি গুরুতর আপত্তি তোলা হয়েছে। এসব আপত্তিতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, চুক্তির শর্ত ভেঙে কাজের পরিমাণ কমিয়ে এবং ইউনিট রেট বাড়িয়ে ঠিকাদারকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে রাষ্ট্রের ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৭২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা বলে অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চহারে চুক্তি করে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ১ হাজার ২২১ কোটি ৬ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগও রয়েছে।
অন্যান্য আপত্তির মধ্যে আছে:
ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ নিশ্চিত না করে ৪০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার বিল পরিশোধ
ড্রয়িং, ডিজাইন ও বিওকিউ (BOQ) ছাড়া ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়
ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণের নামে অস্বাভাবিক ব্যয়ের মাধ্যমে ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকার ক্ষতি
অডিট প্রতিবেদনের আরেকটি বিষয় হলো, প্রকল্প এলাকায় ব্যবহারের জন্য জাপান থেকে আনা বিলাসবহুল গাড়িগুলোর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের আন্তর্জাতিক ‘টিম লিডার’ পদের জন্য দরপত্রে বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি নির্ধারণ করা ছিল। কিন্তু ‘স্যামবো-জেভি’ (SAMBO-led JV) এমন একজনের সিভি জমা দেয়, যাঁর ডিগ্রি এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) এবং দাতা সংস্থা ইডিসিএফের (EDCF) নীতিমালা অনুযায়ী দরপত্র জমা দেওয়ার পর কোনো দরদাতার মৌলিক যোগ্যতার ঘাটতি সংশোধনের সুযোগ নেই।
তবে নথিপত্র অনুযায়ী, প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট একটি গোপনীয় চিঠিতে ওই দরদাতার কাছে জানতে চান, কৃষি প্রকৌশলের ডিগ্রিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমান হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না। এ নিয়ে একজন দরদাতা সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কৃষি প্রকৌশল ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এক নয় এবং নির্ধারিত বাধ্যতামূলক যোগ্যতার বদলে অন্য ডিগ্রিকে সমমান ধরার চেষ্টা নিয়মবহির্ভূত।
সিডিআরপি প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নেও দ্বৈত নীতির অভিযোগ উঠেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ম্যাক্স (MAX) নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের আর্থিক সক্ষমতায় ঘাটতি থাকার পরও তাদের কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের আইটিবি, বিডিএস ও সেকশন ৩ অনুযায়ী একাধিক কন্ট্রাক্ট মূল্যায়নে ‘লিস্ট-কস্ট কম্বিনেশন’ পদ্ধতি অনুসরণের কথা। অর্থাৎ কোনো দরদাতা একাধিক কন্ট্রাক্টের জন্য দর দিলে এবং একসঙ্গে একাধিক কাজ পেলে ছাড়ের প্রস্তাব দিলে কোন সমন্বয়ে সরকারের সামগ্রিক ব্যয় সবচেয়ে কম হবে, তা বিবেচনা করতে হয়। তবে একাধিক কন্ট্রাক্টে সর্বনিম্ন দরদাতা হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব কাজ দেওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠানটির গড় বার্ষিক নির্মাণ টার্নওভার, আর্থিক সক্ষমতা, যন্ত্রপাতি ও জনবলের সম্মিলিত সক্ষমতাও যাচাই করার নিয়ম আছে।
প্রকল্পের আইটিবি ৩৭.৪ অনুযায়ী, ডব্লিউডি-১ ও ডব্লিউডি-২ এই দুটি কন্ট্রাক্ট একসঙ্গে পেতে হলে দরদাতার সম্মিলিত বার্ষিক টার্নওভার (AACT) ২২০ মিলিয়ন ডলার থাকা বাধ্যতামূলক। অভিযোগ অনুযায়ী, ম্যাক্সের টার্নওভার ২০৮.১৭ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে কম থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটিকে দুটি কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।
সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়, অন্য দরদাতাদের ক্ষেত্রে কমপ্লিশন সার্টিফিকেট, এসআইএল-৪/ইউজার সার্টিফিকেট বা টেস্ট রিপোর্টের মতো তুলনামূলক ছোট ঘাটতির কারণে তাঁদের টেকনিক্যালি ‘নন-রেসপন্সিভ’ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে ম্যাক্সের মৌলিক ও বাধ্যতামূলক যোগ্যতায় ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও তাদের যোগ্য বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, খসড়া নথিতে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা সাশ্রয়ের যুক্তি দেখিয়ে ম্যাক্সকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সম্মতি চাওয়ার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ছাড়া একাধিক বড় প্রকল্প দেওয়া হলে নির্মাণমান, বাস্তবায়নকাল ও ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মেগা প্রকল্পের বাইরে রেলের ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রেলওয়ের ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল’-এর ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জমির সীমানা রক্ষা ও দখল প্রতিরোধে বিভাগীয় প্রকৌশলীদের (ডিইএন) ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষমতা একজন জেলা প্রশাসকের সমপর্যায়ের বলেও উল্লেখ আছে।
কিন্তু রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় রেলের শতকোটি টাকা মূল্যের জমিতে ৫৬০টির বেশি স্থায়ী দোকান নির্মাণ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রকৌশলী/১ দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও তা যথাযথভাবে পালন করেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনেও এসব স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাঁদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এবং রেল কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারার বিনিময়ে এই স্থাপনা গড়ে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ের এডিজি-১ আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের সঙ্গে প্রতিবেদক একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন। ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি এবং পরে কোনো বক্তব্যও দেননি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে তাঁর বক্তব্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি।
সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান হাবিবের সঙ্গে। তিনি বলেন, রেলওয়ের দুর্নীতির বিষয়টি সরকারও জানে। তবে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট তথ্য এলে তা যাচাই করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
একই প্রকল্পে অডিট আপত্তি, দরপত্রের যোগ্যতা, ঠিকাদারের আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারি অর্থ পরিশোধ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসায় স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, প্রকল্পের গুণগত মান ও সময়মতো বাস্তবায়নও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই অডিট আপত্তির নিষ্পত্তি, দরপত্র মূল্যায়নের নথি যাচাই















