
তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. একরামুল হক তাজুকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে দুটি পৃথক বিষয় আলোচনায় এসেছে। একদিকে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিপুল পরিমাণ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বকেয়া থাকার তথ্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার মানিকদিয়া এগারপাড়া আলিম মাদ্রাসার সাবেক সভাপতি হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও মাদ্রাসা পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ভ্যাট-সংক্রান্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, লাভেলো আইসক্রিমের কাছে অপরিশোধিত রাজস্বের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে আগের দুই দফা দাবির বিপরীতে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান থাকায় রাজস্ব আদায়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছে ময়মনসিংহ ভ্যাট কমিশনারেট। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নতুন করে প্রায় ২৫ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির মামলা এবং আরও প্রায় ৩৬ কোটি টাকার মামলা প্রক্রিয়াধীন থাকার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন থাকা অবস্থায় লাভেলোর বিরুদ্ধে ৩৩ কোটি ৭২ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৫ টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষে এ অর্থ আদায়ের জন্য চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়। এর পর প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ আদালতে রিট করে।
পরবর্তীতে একই বছরের ৪ জুন আরও ৩৮ কোটি ২৭ লাখ ৭৪ হাজার ৮৮৫ টাকার দাবিনামা জারি করা হয় বলে ভ্যাট-সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এই দাবির বিরুদ্ধেও প্রতিষ্ঠানটি আদালতের দ্বারস্থ হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই মামলায় সংশ্লিষ্ট দাবির পরিমাণ প্রায় ৭২ কোটি টাকা।
রাজস্ব পরিশোধ না করায় একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায় শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) লক এবং ব্যাংক হিসাব স্থগিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরে আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশের মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রাখার সুযোগ দেওয়া হয় এবং দাবিকৃত অর্থের একটি অংশ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে বাকি অর্থ পরিশোধ নিয়ে প্রতিষ্ঠান ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত থাকে। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের কারণে রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি দীর্ঘায়িত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল না করায় নতুন করে বকেয়া বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের রিটার্ন দাখিল না করার অভিযোগে ১০ কোটি ৪৬ লাখ ২৯ হাজার ৭৬৪ টাকার কর ফাঁকির মামলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ের রিটার্ন ও রাজস্ব পরিশোধের বিষয়ে আরও ৫২ কোটি ২৫ লাখ ২২ হাজার ২৯১ টাকার কর ফাঁকির মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনে ময়মনসিংহ ভ্যাট কমিশনারেটের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, লাভেলোর কাছে মোট রাজস্ব বকেয়া প্রায় ১৩২ কোটি টাকা। একই প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ অস্বীকার করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
‘ই-ভ্যাট সিস্টেমে রিটার্ন দেওয়া যাচ্ছে না’
ভ্যাট রিটার্ন দাখিল না করার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা হলো—ই-ভ্যাট ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী কর মেয়াদের রিটার্ন সাবমিট না করলে পরবর্তী সময়ের রিটার্ন জমা দেওয়া যাচ্ছে না। আগের কর মেয়াদের রাজস্ব আদালতে বিচারাধীন থাকায় পরবর্তী সময়ের রিটার্নও জমা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।
এ কারণে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা করে বকেয়া বাড়ছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে রাজস্ব বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, ই-ভ্যাট ব্যবস্থাকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও বিষয়টি শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব পরিশোধের বিষয়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ময়মনসিংহ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) এস এম সোহেল রহমান বলেন, লাভেলো নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল না করায় বকেয়ার পরিমাণ বাড়ছে। আগের রাজস্ব দাবির বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বিষয়গুলো আদালতে বিচারাধীন। বকেয়া আদায়ের বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান ও অ্যাটর্নি জেনারেলের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মাদ্রাসায় সাবেক সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ
ভ্যাটের এই বিরোধের পাশাপাশি ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে একরামুল হক তাজুকে ঘিরে মেহেরপুরের গাংনীতে আরেক দফা অভিযোগ ওঠে। মানিকদিয়া এগারপাড়া আলিম মাদ্রাসার সাবেক সভাপতি হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এনে স্থানীয় বাসিন্দারা সংবাদ সম্মেলন করেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে এলাকাবাসীর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন স্থানীয় যুবক মো. সোহেল রানা। তাঁদের অভিযোগ, একরামুল হক তাজু দীর্ঘ সময় মাদ্রাসাটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ওই সময়ে মাদ্রাসার পরিচালনা ও ম্যানেজিং কমিটিতে নিজের পরিবারের সদস্যদের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগের মধ্যে ছিল—মাদ্রাসার বিভিন্ন পদে নিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ, প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় ও ম্যানেজিং কমিটির কাঠামো পরিবর্তনে প্রভাব এবং মাদ্রাসার জমিতে একটি ফাউন্ডেশন স্থাপন। নৈশপ্রহরী নিয়োগে বয়সসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও সংবাদ সম্মেলনে করা হয়।
স্থানীয়দের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে কোনো স্বাধীন তদন্তের ফলাফল এই প্রতিবেদনের হাতেের চেষ্টা করা হলেও কোনো নেই। ফলে অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
জবাব মেলেনি
ভ্যাট-সংক্রান্ত অভিযোগ ও মাদ্রাসার বিষয় নিয়ে একরামুল হক তাজুর বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে, ২০২৬ সালের প্রকাশিত প্রতিবেদনে লাভেলোর বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকারের কথাও এসেছে।
ফলে একরামুল হক তাজুকে ঘিরে আলোচনার দুটি ক্ষেত্র—প্রতিষ্ঠানের বিপুল ভ্যাট বকেয়া এবং মাদ্রাসা পরিচালনায় তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ—এখন পৃথক দুই প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ভ্যাটের বিষয়টি আদালত ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, আর মাদ্রাসা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথির যাচাই।















