বিআরটিসি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১০–১১ লাখ টাকার ‘মাসোহারা’ অভিযোগ

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) বর্তমান চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ মাসোহারা বাণিজ্য, ভুয়া ভাউচার এবং স্বজনপ্রীতিসহ ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ডিপো থেকে সরাসরি ‘হ্যান্ড ক্যাশ’ নেওয়া গোপন রাখতে প্রধান কার্যালয়ে দুপুরের খাবার রান্নার কৌশলসহ বিভিন্ন বাস ডিপো, ট্রাক ডিপো, ওয়ার্কশপ ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০-১১ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বিআরটিসির অধীনস্থ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চরম অসন্তোষের মধ্যেও রাজনৈতিক প্রভাব ও কৌশলের কারণে বহাল তবিয়তে রয়েছেন এই কর্মকর্তা।

খাবারের ভাউচারের আড়ালে অবৈধ ক্যাশ লেনদেন

অভিযোগে জানা যায়, মতিঝিল বাস ডিপোর ভেতরে প্রতিদিন সকালে বিআরটিসির প্রধান কার্যালয়ের জন্য দুপুরের খাবার রান্না করা হয়। এই খাবারের দোহাই দিয়ে মতিঝিল ডিপোর তহবিল থেকে প্রতি মাসে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকার অবৈধ ভাউচার কাটা হচ্ছে। সাধারণ কর্মচারীদের একাংশের মতে, সরাসরি ক্যাশ মাসোহারা নেওয়ার বিষয়টিকে আড়াল করতেই এই খাবারের আয়োজন ও ভাউচার জালিয়াতির পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।

ডিপো, ওয়ার্কশপ ও ট্রেনিং সেন্টারের মাসোহারা তালিকা

প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন খাত থেকে নির্ধারিত হারে নিয়মিত অবৈধ অর্থ আদায়ের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা তুলে ধরা হলো:

বাস ডিপো (২৪টি): ডিপোভেদে দিনে ১ হাজার টাকা হারে গাড়িপ্রতি এবং কাউন্টার থেকে গড়ে ৪৫ হাজার টাকা করে মাসোহারা নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ২৪টি ডিপো থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা (মাসে ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা) আদায় করা হয়।

ট্রাক ডিপো (২টি): তেজগাঁও ট্রাক ডিপো থেকে মাসে ১১ লাখ টাকা এবং চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো থেকে মাসে ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।

ওয়ার্কশপ ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট: সিডব্লিউএস ও আইসিডব্লিউএস কারখানায় প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা এবং দেশের ৯টি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে প্রতি মাসে মোট ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা আদায় করা হয়।

এককালীন অর্থ গ্রহণ: বিআরটিসিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ২৪টি ডিপো থেকে এককালীন ১১ থেকে ১৬ লাখ টাকা করে মোট ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ক্যাশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে চালক ও কর্মীদের বেতন পেতে দীর্ঘ বিলম্ব দেখা দেয়।

বাজেট বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও স্বজনপ্রীতি

অফিস কক্ষ সংস্কারের নাম করে ৫৬ লাখ টাকা বাজেট ধরে ৪০ লাখ টাকা পকেটে পুরে নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার অপারেটিং ব্যয় ১৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করার অভিযোগ উঠে এসেছে। তাছাড়াও, পূর্বের আমলাতান্ত্রিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কর্মচারীদের তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।

বিশিষ্ট ব্যক্তি ও কমিশনের বক্তব্য

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সরকারি পদে বসে অবৈধভাবে অর্থ উত্তোলন কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে দুদকের বিশদ ও সমন্বিত অনুসন্ধান প্রয়োজন।” অন্যদিকে, দুদক প্রধান জানান যে, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে ছাড় দেওয়া হবে না। (বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।)

বিআরটিসির সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বদলে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বিভিন্ন বাস/ট্রাক ডিপো, ওয়ার্কশপ ও সংস্কার খাত থেকে ভুয়া ভাউচার ও হ্যান্ড ক্যাশের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থ তুলছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। সাধারণ চালক ও কর্মচারীদের বেতন ভোগান্তির বিনিময়ে এই মাসোহারা সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে, যা দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের দাবি রাখে।