সাতক্ষীরা পৌর ভূমি অফিসের নায়েব ঘুষের ‘মহারাণী’ শর্মিষ্ঠা সরকারের মাসিক হাত খরচ লাখ টাকা

সাতক্ষীরা পৌর ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সরকারের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এলাকা জুড়ে তিনি ‘মাস্ক লেডি’ নামে পরিচিত। মিষ্টি কথা ও চতুর কৌশলের আড়ালে তিনি এবং তাঁর দালাল সিন্ডিকেট সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন।

দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ও অভিযোগসমূহ

নামজারি ও প্রতিবেদনে ঘুষ দাবি: চালতেতলা এলাকার আলম ড্রাইভারের অভিযোগ, আদালতের রায় পাওয়ার পর নামজারির জন্য প্রথমে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়, যা পরবর্তীতে ২০ হাজার টাকায় রফা হয়।

বিপক্ষকে সুবিধা প্রদান: থানাঘাটার ভুক্তভোগী ফারুক হোসেনের অভিযোগ, জমির ১৪৫ ধারার প্রতিবেদনের জন্য তাঁর কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নিয়ে তিনি বিপক্ষ পার্টির অনুকূলে রিপোর্ট দিয়েছেন। এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে।

দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: পুরাতন সাতক্ষীরার বাসিন্দা জাহিদ জানান, শর্মিষ্ঠার নিজস্ব দালাল মুকুল ও আলিম সিন্ডিকেটের মাধ্যম ছাড়া কোনো ফাইল পাস হয় না। নামজারির জন্য সর্বনিম্ন ৭ হাজার টাকা না দিলে আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হয়।

অনিয়মের ধরণ: সাধারণ নামজারির জন্য ১,০০০ টাকা এবং তদন্ত রিপোর্টের জন্য ১ থেকে ২ হাজার টাকা বাধ্যতামূলক নেওয়া হয়। জটিলতার ওপর ভিত্তি করে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। ঘুষের ভাগ-বাটোয়ারা নিশ্চিত করতে নিজস্ব ডায়রিতে হিসাব রাখার অভিযোগও রয়েছে।

আয়ের সাথে সঙ্গতিহীন বিলাসী জীবন

১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও শর্মিষ্ঠা সরকারের মাসিক খরচ লাখ টাকার বেশি। অনুসন্ধানে জানা যায়:

কালিগঞ্জ ও সাতক্ষীরা সদরে জোড়া ভাড়া বাসা মেইনটেইন করতেই প্রতি মাসে ১০-১৫ হাজার টাকা খরচ হয়।

ঢাকা, কালিগঞ্জ ও খুলনা রুটে যাতায়াতের জন্য বছরে ৩-৪ মাস প্রাইভেট কার রিজার্ভ রাখেন।

পার্লারে প্রতি সপ্তাহে হাজার হাজার টাকা ব্যয়সহ পরিবার ও মা-বাবার সমস্ত খরচের মূল চালিকাশক্তি তিনি।

অবৈধ সম্পদ রূপান্তর ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ

দুদকের চোখ ফাঁকি দিতে দুর্নীতির টাকা তিনি নিজের নামে না রেখে স্বামী ও ছোট বোনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বোনের নামে জমি ও দোতলা বাড়ি নির্মাণ এবং কালিগঞ্জে ৫০-৬০ লক্ষ টাকার প্লটসহ স্বামীর নামে বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি ক্রয়ের অভিযোগ উঠেছে, যা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

এছাড়া কালিগঞ্জের মৌতলা, ভাড়াশিমলা, বসন্তপুর, শ্যামনগর, পারুলিয়া এবং আগরদাড়ি ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনের সময়েও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের ইতিহাস রয়েছে।

প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনিক বক্তব্য

স্থানীয় নাগরিক নেতা আবুল হাসান অভিযোগ করে জানান, “মাস্কের আড়ালে শর্মিষ্ঠা সরকার দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। দেশে-বিদেশে থাকা তাঁর অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তাঁকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা ও চাকরিচ্যুত করা উচিত।”

এ বিষয়ে কথা বলতে শর্মিষ্ঠা সরকারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে ফোন কেটে দেন।

তবে সাতক্ষীরা সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বদরুদ্দোজা জানান, বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং দুর্নীতির বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।