
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এর অধীন আধুনিক সার গুদাম নির্মাণ ও পুরনোগুলোর মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি আর লুটপাটের মাধ্যমে বরাদ্দের একটি বড় অংশ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
অভিযোগ মতে, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মুজিবুর রহমান নিষিদ্ধঘোষিত পতিত লীগ সরকারের একনিষ্ঠ দোসর। তিনি সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের আস্থাভাজন ও আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী মুজিবুরে বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক দুনীতির কারণে সদ্য সমাপ্ত প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে চলেছে। পিডি মুজিবরের নেতৃত্বে প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ না করে কাজ বাস্তবায়নের নামে বছরের পর বছর চালানো হয়েছে নীরব হরিলুট। প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গে ভূয়া বিল-ভাউচার ও নিম্নমাণের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে নিজের আখের গুছিয়ে নিতে লাগামহীন দুর্নীতি ও অপ্রতিরোধ্য লুটপাটের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।
নির্ভরযোগ্য সুত্রে যানা যায়, বিএডিসির অধিনে কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়াতে সারাদেশে বিভিন্ন জেলায় সার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ কার্যক্রম জোড়দার করনের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষির সামগ্রিক উন্নয়নের সহায়ক ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্য প্রকল্পের আওতায় কার্যক্রম সমাপ্তি হয় চলতি বছরের জুন মাসে। লুটপাটের উদ্দেশ্যে প্ল্যানিং ও ডিজাইনে ঘাপলা করে প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৯ সালে। এর ভেতর কয়েকজন পিডি পরিবর্তন হলেও লীগের দোসর উপপরিচালক মুজিবুর পিডির পদটি বাগিয়ে নেন অবৈধ অর্থ ও স্বৈরাচারের রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটিয়ে। সর্বশেষে মুজিবুর পিডির দায়িত্বে থেকে করেছেন পুকুর চুরি। তার এই বেপরোয়া লুটপাট বালিশকান্ডকেও হার মানিয়ে দুনীতির মাধ্যমে প্রকল্পের কর্যক্রমে অর্থিক অনিয়মের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তিনি। বিএডিসির বেশীরভাগ উর্দ্ধতন কর্মকর্তা পিডি মুজিবরের অদক্ষতা দুনীতির বিষয়ে নিরব ভুমিকা পালন করায় বিএডিসির সকল কার্যক্রম এখন প্রশ্নের মুখে। ২১টি জেলায় নির্মিত হয়েছে সারগুদামের নতুন গুদাম ঘর। তথাকথিত আধুনিক এ ভবন নির্মাণের শুরুতে যথাযথ মাটি পরীক্ষা এবং নির্মাণকালীন পর্যাপ্ত লোডটেস্ট হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ছিল না কোন স্বচ্ছতা। ফলে ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে এমনটা আশঙ্কা স্থানীয়দের।
বিএডিসির একাধিক কর্মকর্তার মতে, চোখ ধাঁধানো নান্দনিকতার আধুনিক এ গুদাম ভবন নির্মাণ কাজে, সিডিউল বহির্ভূতভাবে নি¤œমাণের নির্মাণ সামগ্রী ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। ভবনগুলোর ডিজাইনের পেছনে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের একটি কৌশল কাজ করেছে প্রকল্প পরিচালকের। এছাড়াও প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, পিডির ইচ্ছেমতো স্থান নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে এরই মধ্যে উঠতে শুরু করেছে নানা ধরণের প্রশ্ন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রংপুরের আলমনগরের নতুন নির্মিত গুদাম ঘর নির্মাণ বিশিষ্ট ভবনের কাজ শেষে এখনও বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ চলছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও পিডির তেমন কোন মাথাব্যাথা নেই। প্রকল্পের সাইটের এলাকাবাসী আবদুল মান্নান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যেই ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী হবে। হালকা ভূমিকম্পে ঢাকা ও আশপাশে ‘বড় কাঁপুনি’ হলে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে নবনির্মিত এই গুদাম ঘরটি। প্রকল্পের তথ্য বলছে, প্রকল্পের আওতায় সার গুদাম ঘর ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হয়। যদিও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে অনেক পরে। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫০.৮৮ কোটি টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নান্দনিকতার এ ভবন নির্মাণের শুরু থেকেই ছিল না কোনো জবাবদিহিতা। এই গুদাম ঘর ভবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ফাউন্ডেশন কাঠামো নিরাপদ এবং টেকসই কিনা যাচাইয়ের জন্য ‘পাইল লোড টেস্ট’। আধুনিক কিংবা বহুতল ভবন নির্মাণে এ লোডটেস্ট করা বাধ্যতামূলক হলেও তা করেনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। কিংবা তদারকি দায়িত্বে থাকা পিডির থাকলেও তাদের অবহেলার ফলে প্রকল্পের আওতায় সার গুদাম ঘর নির্মাণের বড় ধরনে দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
দিনাজপুর বিরামপুরের বাসিন্দা আবুল কাশেম গণমাধ্যমকে বলেন, অত্র এলাকার ৭২০০ মেট্রিকটন ধারণ ক্ষমতার সার গুদাম ভবনটি বাইরের দিকটা অত্যন্ত সুন্দর দেখতে। কিন্তু শুরু থেকেই এর নির্মাণ কাজে অনিয়ম করা হয়েছে। এমনিতেই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে সেই স্থানে, যেখানে পাইলিং এর পর বালু ভরাট না করে করা হয়েছিল মাটি ভরাট। আর লোডটেস্ট করতে দেখিনি আমরা। এ ভবনটি কি করে টেকসই হবে তো, এমন প্রশ্ন তাদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্ত বিএডিসি’র একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পাইলিং এর কাজ করার সময় বৃষ্টি ছিল। ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহৃত পাথরের কংকরগুলো মাটির সাথে মিশে একাকার হয়েছিলো। এভাবেই চলছিল ঢালাই। আর এ প্রকল্পের যে সাইট ইঞ্জিনিয়ার ছিল, সেতো নামেমাত্র দায়িত্ব পালন করেছে। তাদের তেমন কোন ভূমিকা দেখিনি। ঠিকাদারের উপর নির্ভর করেছে সবকিছু। শুধুমাত্র পিডির আর্থিক অনিয়মের কারণে পুরো প্রকল্পটি ব্যর্থ হতে চলেছে।।
ঠিকাদার কতৃক সিডিউল অনুযায়ী ভালো মানের রড ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শুরু থেকে নানা অনিয়মের কথা শুনেছি। তিনি আরও বলেন, গুদাম ঘর নির্মাণ প্রকল্পের এতো বিশাল পরিমাণ টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ কোন দরকার ছিল না। দৃষ্টিনন্দন নকশা বা বিলাসবহুল উপকরণের কথা বলে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এটি প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেদের পকেট উন্নয়নের জন্যই সরকারি টাকা অপচয় করছে। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বহুতল ভবন নির্মাণে ক্ষেত্রে পাইলিং এর কাজ শেষে স্থাপনার নকশা এবং কাঠামোর ধরণ অনুযায়ী নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী লোডটেস্ট করতে হয়। টেস্টের ফলাফল ঠিক থাকলে ভবন সম্প্রসারণে কাজ শুরু হয়। বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ছাড়া ভবনের ভিত্তি কতটা নিরাপদ, তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। অন্যথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পরতে পারে নব নির্মিত গুদাম ঘর নির্মাণ। অন্যদিকে গুদামঘর সংস্কার ও মেরামত কাজের নামে ব্যাপক আর্থিক দুনীতির আশ্রয় নেয় হয়েছে। কাগজে-কলমে সংস্কার মেরামত করা হয়েছে। বাস্তব কিছুই হয়নি। ভূয়া বিল ভাউচার বানিয়ে সমূদয় টাকা আত্মসাৎ করছেন পিডি মুজিবর। যা সরেজমিনে তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসবে বলে মনে করেন তারা।
অভিযোগ আছে, চোখ ধাঁধানো নান্দনিকতার আধুনিক এ ভবন ডিজাইনের পেছনে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের কৌশল প্রকল্প পরিচালক মুজিবর’র নিজের পকেটের উন্নয়নের জন্যই দৃষ্টিনন্দন নকশা বা বিলাসবহুল উপকরণের কথা বলে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় মাত্রাতিরিক্তভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক ও কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা করেন নাই। যে কারণে অনেক অনিয়ম চাপা পড়ে যায়। ফলে জনগণের কোটি কোটি টাকার প্রকল্পেও কাঠামোগত নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সরকারি অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভবনে যদি নীতিমালা অনুসরণ না করা হয়, তাহলে তা শুধু অর্থের অপচয় নয়, মানুষের জীবনের জন্যও নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বিএডিসি’র কর্মকর্তারা।
মূলত ঠিকাদার আর প্রকল্প পরিচালক মিলেমিশে ভাগ-বাটোয়ারা করার জন্যই প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রকল্প পরিচালকের নেতৃত্বে। বাহ্যিক দৃষ্টিনন্দন আধুনিক গুদাম ঘর নির্মাণ ভবন নির্মাণে অত্যধিক ব্যয়, নিম্নমাণের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারসহ অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন বিএডিসির সাধারণ কর্মকর্তারা। উল্লেখিত অভিযোগ এর বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মুজিবুরের মোবাইলে ফোন দিয়ে সদ্য সমাপ্ত প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় সকল কার্যক্রম সমাপ্তি ১০০% না হলেও, প্রকল্পের সময় বৃদ্ধির জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সুত্রে যানা যায়, উক্ত প্রকল্পের সময় বৃদ্ধির কোন আবেদনের বিষয়ে অবগত নন তারা। প্রকল্পের আওতায় আর্থিক দুনীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উত্তর না দিয়ে পরে কথা বলবেন বলে লাইনটি কেটে দেন।















