
নদী খননের নামে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের কোটি কোটি টাকার লুটপাট ও অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর, তা ধামাচাপা দিতে মাঠে নেমেছে একটি চক্র। কথিত সাংবাদিক ও তদবিরবাজ রাসেল সরকার নামের এক ব্যক্তি ‘ন্যাশনাল জার্নালিস্ট ফোরাম (এনজেএফ)’ নামক একটি ভুয়া বা অস্তিত্বহীন সংগঠনের প্যাড ব্যবহার করে গণমাধ্যমকর্মীদের হুমকি ও অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে মূলধারার সাংবাদিকদের বিতর্কিত করার এই অপচেষ্টায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালের সম্পাদকবৃন্দ।
ঘটনার সূত্রপাত, গত ০২ জুলাই ২০২৬ তারিখে খবর২৪, আমাদের মাতৃভূমি, ভয়েজ নিউজ, বর্তমান বাংলা, ভোরের হাওয়া, সংবাদ প্রতিদিনসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের নদী খনন প্রকল্পের দুর্নীতি ও লুটপাটের খতিয়ান নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এই সংবাদ প্রকাশের পর, নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ও প্রক্রিয়াধীন অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘দুর্নীতির ডায়েরি’র সম্পাদকের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে ০১৭২৬৯১৫৫২৪ (01726915524) থেকে একটি কল আসে। কলকারী প্রথমে নিজেকে সাধারণ পাবলিক দাবি করে নিউজের তথ্যপ্রমাণ ও পোর্টালের অনুমোদন আছে কি না—তা নিয়ে অবান্তর প্রশ্ন ও জেরা করতে থাকেন।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে কলকারী ব্যক্তি নিজেকে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে পরিচয় দেন এবং জানান তার নাম রাসেল সরকার, তিনি ‘অর্থনীতি পত্রিকা’য় কাজ করেন। তবে নিজের সুনির্দিষ্ট কোনো পদবী তিনি উল্লেখ করতে পারেননি।
কথোপকথন চলাকালীন রাসেল সরকার ‘দুর্নীতির ডায়েরি’র সম্পাদককে সংবাদটি ডিলিট বা সরিয়ে ফেলার জন্য নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি বরিশালে গিয়েও প্রকৌশলী মামুনের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি খুঁজে পাননি এবং মাইটিভি বা একাত্তর টেলিভিশনের অনুসন্ধানেও কিছু বের হয়নি। শুধু তাই নয়, প্রকৌশলী মামুনের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি বলেন, “মামুন উর রশিদ সাহেব এর আগে নিউজ করার পর আমাকে ডেকে জোর করে নিউজ ডিলিট করিয়েছেন এবং মতিঝিল থানায় মামলা করেছেন, যে মামলায় আমি নিজেই দুইবার কোর্টে হাজিরা দিয়েছি।”
এই ধরনের মামলার ভয় দেখিয়ে নিউজ ডিলিটের চাপ দেওয়া হলে দুর্নীতির ডায়েরির সম্পাদক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “যদি উনি (প্রকৌশলী মামুন) কোনো অনিয়ম না করে থাকেন এবং আয়ের সাথে সম্পদের সামঞ্জস্য থাকে, তবে তিনি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু সত্য সংবাদ ডিলিট করা হবে না।”
সুবিধা করতে না পেরে রাসেল সরকার ৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে রাসেল সরকার ‘ন্যাশনাল জার্নালিস্ট ফোরাম (এনজেএফ)’ নামক একটি সংগঠনের প্যাড ব্যবহার করে একটি কথিত ‘জরুরী সতর্কবার্তা’র পিডিএফ কপি বিভিন্ন গণমাধ্যম হাউজের কর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপে ছড়াতে থাকেন।
উক্ত চিঠিতে জিলুর রহমান নামক এক লেখকের বইয়ের নাম নকল করে ‘দুর্নীতির ডায়েরি’ পোর্টাল চালানো হচ্ছে এবং ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে সম্পূর্ণ মনগড়া, ভিত্তিহীন ও কুৎসামূলক বক্তব্য দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘ন্যাশনাল জার্নালিস্ট ফোরাম (এনজেএফ)’ নামে অনুমোদিত কোনো সাংবাদিক সংগঠনের অস্তিত্ব ইন্টারনেটে বা তথাকথিত সাংবাদিক মহলে নেই। প্রকৃতপক্ষে ‘NJF’ বলতে ঢাকাস্থ নোয়াখালীর সাংবাদিকদের সংগঠন ‘নোয়াখালী জার্নালিস্ট ফোরাম’কে বোঝায়। এছাড়া সরকারি রেজিস্টার্ড (রেজি নং: এস৪২১৯৯) বৈধ সংগঠনটির নাম হলো ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল জার্নালিস্ট ফোরাম (বিএনজেএফ)’, যার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এ এস এম জিয়া হায়দার। রাসেল সরকার মূলত নিজের আখের গোছাতে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের তদবির করতে ‘ন্যাশনাল জার্নালিস্ট ফোরাম’ নামের এই ভুঁইফোড় ও ক্লোন প্যাড তৈরি করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাসেল সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে আসলে, তা ধামাচাপা দেওয়ার কথা বলে ওই কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা বা মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন। বিনিময়ে তিনি সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের প্রলোভন, ভয়ভীতি বা ভুয়া প্যাডে অপপ্রচার চালিয়ে নিউজ ডিলিট করার মিশন নিয়ে তদবিরবাজি করেন।
এই ভুয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পিডিএফ কপিটি নজরে আসার পর ‘দুর্নীতির ডায়েরি’র সম্পাদকের পক্ষ থেকে রাসেল সরকারকে ফোন করে এই অপপ্রচারের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং কোনো সদুত্তর না দিয়ে তড়িঘড়ি করে ফোন কেটে দেন।
একজন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তার পক্ষ নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা এবং সাংবাদিকদের নামে ভুয়া সংগঠনের প্যাডে কুৎসা রটানোর এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদকবৃন্দ। তারা বলছেন, এই ধরনের কথিত সাংবাদিক ও তদবিরবাজদের কারণেই মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশলী মামুনের দুর্নীতির তদন্ত করার পাশাপাশি এই চক্রের হোতা রাসেল সরকারের বিরুদ্ধেও দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা।















