নকশা জালিয়াতি ও বালু ভরাটের ‘ভূতুড়ে বিল’ করে চিলমারী নদীবন্দর প্রকল্পে ৩৩৫ কোটি টাকার হরিলুট!

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) বাস্তবায়নাধীন চিলমারী নদীবন্দর স্থাপন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম, নকশা জালিয়াতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার এই প্রকল্পটির ব্যয় সংশোধিত ডিপিপির (DPP) মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৩৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বর্ধিত ব্যয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ মোল্লা এবং সাবেক নৌ-প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট একযোগে রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুটে মেতেছিল।

তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত সরকারের নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর এপিএস বাশার, ডি.জি. বাংলা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আরশাদ পারভেজ এবং ডিপন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সজল চন্দ্র দত্তের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী চক্র পুরো প্রকল্পের টেন্ডার ও বিল নিয়ন্ত্রণ করত, যার নেপথ্য কারিগর ছিলেন স্বয়ং পিডি আজাদ মোল্লা।

পাইলিংয়ে নজিরবিহীন জালিয়াতি: ঝুঁকির মুখে অবকাঠামো
প্রকল্পের আওতাধীন ভবন ও স্থাপনা নির্মাণে অনুমোদিত মূল নকশা (Design) চরমভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে পাইলিংয়ের কাজে যে জালিয়াতি করা হয়েছে, তা ভবনগুলোর স্থায়িত্বকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে। নথিপত্রের তথ্যের সাথে বাস্তব কাজের তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

পাইলিংয়ের বিবরণ মূল নকশার নির্দেশনা বাস্তবে যা ব্যবহার করা হয়েছে
পাইলিং ব্যাস ৫০০ মিলিমিটার (মিমি) ৩০০ মিলিমিটার (মিমি)
দৈর্ঘ্য (গভীরতা) ৪০.৫০ মিটার মাত্র ২৩ মিটার
রডের ব্যবহার ১৬ মিমি রডের ১০টি বার মাত্র ৭টি বার
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালকের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে মূল ড্রয়িং গোপন করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নিম্নমানের ড্রয়িং তৈরি করে ঠিকাদারদের পকেট ভারী করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

সাইট ডেভেলপমেন্টে ‘বালুহীন’ ভূতুড়ে বিল ও জমি অধিগ্রহণে জালিয়াতি
প্রকল্পের আরেকটি বড় দুর্নীতির খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ‘সাইট ডেভেলপমেন্ট’ বা বালু ভরাট কাজ। নদী তীরবর্তী এলাকায় কোটি কোটি টাকার বালু ভরাটের বিল তোলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কাজ সম্পন্ন না করেই সম্পূর্ণ ভুয়া সনদের মাধ্যমে অর্থ লোপাট করা হয়েছে।

পাশাপাশি, প্রকল্প এলাকার সাধারণ বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, চিলমারী নদীবন্দরের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বঞ্চিত করে প্রভাবশালীদের পকেটস্থ করা হয়েছে বিপুল অর্থ।

অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে পেমেন্ট! কর্মকর্তাদের অসহায়ত্ব
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কাগজপত্রে কাজের দায়িত্ব যৌথ উদ্যোগে (Joint Venture) এক প্রতিষ্ঠানের নামে থাকলেও, বিল বা পেমেন্ট সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে। যা সরকারি আর্থিক বিধিমালার (PPR) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কোনো কোনো আইটেমে কোনো কাজ না করেই অগ্রিম বিল তুলে নিয়ে তা সিন্ডিকেটের মধ্যে ভাগাভাগি করার কিছু গোপন নথিও এখন সামনে এসেছে।

বিআইডাব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান:

“সাবেক প্রতিমন্ত্রীর এপিএস ও প্রভাবশালীদের রাজনৈতিক দাপটের কারণে প্রকল্পের ভেতরে কোনো কর্মকর্তার কথা বলার বা আপত্তি দেওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ ছিল না। তারা যেভাবে চেয়েছে, সেভাবেই ফাইল পাস করাতে বাধ্য করা হয়েছে।”

পিডির মোবাইল বন্ধ, উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি
এসব সুনির্দিষ্ট ও চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ মোল্লার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

নদীবন্দরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোকে এভাবে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। প্রকল্পের আর্থিক অনিয়ম, টেন্ডার জালিয়াতি ও পাইলিংয়ের মান পরীক্ষার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের ও স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের জোরালো দাবি উঠেছে।