
বাংলাদেশের কৃষি খাতের অন্যতম চালিকাশক্তি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে (ডিএই) নিয়ম-নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর তোয়াক্কা না করে চলছে নজিরবিহীন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থ আত্মসাৎ। ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কার কাজ, কেনাকাটা এবং বদলি-নিয়োগ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী ও ধরাছোঁয়ার বাইরের সিন্ডিকেট। অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, এই চক্রের আর্থিক অনিয়মের ভয়াবহতা বহুল আলোচিত ‘রূপপুর বালিশ কাণ্ড’কেও হার মানিয়েছে।
ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, টেন্ডার ছাড়াই কোটেশনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাট এবং অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের অবৈধভাবে কার্যালয় ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়ে অধিদপ্তরকে কার্যত ‘দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে’ পরিণত করা হয়েছে।
সিন্ডিকেটের নেপথ্যে: ‘ত্রি-রত্ন’ ও তাদের ক্ষমতার উৎস
অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যানুযায়ী, এই পুরো লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে চার সদস্যের একটি চক্র, যাদের অধিদপ্তরে ‘ত্রি-রত্ন সিন্ডিকেট’ নামে ডাকা হয়। এই চক্রের মূল হোতারা হলেন:
হাবিবুল্লাহ (পরিচালক, প্রশাসন): সিন্ডিকেটের মূল প্রশাসনিক খুঁটি। তার ছত্রছায়ায় ও ইন্ধনেই সব ধরনের অবৈধ আদেশ ও পদায়ন বৈধতা পায়।
সহিদুল আমিন (অতিরিক্ত উপ-পরিচালক, লিসাসা/প্রশাসন ও অর্থ): অর্থ অবমুক্তি এবং ভুয়া বিল-ভাউচার পাসের মূল কারিগর।
ইকবাল হারুন বাপ্পী (উপ-সহকারী প্রকৌশলী, পাওয়ার): কারিগরি ও ভৌত অবকাঠামো খাতের বরাদ্দ লোপাটের প্রধান ব্যক্তি। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে বড় দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে।
আরিফুল ইসলাম (মেকানিক): মাঠপর্যায়ের ভুয়া চাহিদাপত্র ও বিল তৈরিতে সহায়তাকারী এবং সিন্ডিকেটের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী।
এই চক্রের অনিয়ন্ত্রিত দাপটের কারণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দীর্ঘদিনের চেইন অব কমান্ড বা প্রশাসনিক নিয়মনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
৩০০ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে জুনিয়র কর্মকর্তার হাতে কোটি কোটি টাকার দায়িত্ব
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে বর্তমানে প্রায় ৩০০ জন বিএসসি (BSc) শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন নির্বাহী প্রকৌশলী কর্মরত রয়েছেন। অথচ নিয়ম লঙ্ঘন করে অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে একজন সাধারণ জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার তথা উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পাওয়ার) ইকবাল হারুন বাপ্পীকে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন শাখার নির্বাহী প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দক্ষ ও পেশাদার প্রকৌশলীদের সরিয়ে বাপ্পীকে এই চেয়ারে বসানোর একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল অবাধে আর্থিক অনিয়ম করা। বাপ্পী ও সহিদুল আমিন জুটি সিন্ডিকেটের স্বার্থরক্ষা করে কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ছাড়াই কোটি কোটি টাকার তহবিল ছাড় ও তছরুপ করছেন।
টেন্ডার ছাড়াই কোটি কোটি টাকার ‘কোটেশন বাণিজ্য’
উন্নয়ন ও সংস্কার কাজের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র বা ই-জিপি (e-GP) টেন্ডার প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক হলেও এই সিন্ডিকেট সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছে। ঠিকাদারদের সাথে গোপন আঁতাত ও কমিশন চুক্তির মাধ্যমে তারা সরকারি অর্থ লুটপাটের জন্য ‘কোটেশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করছে। নিচের খাতগুলোতে কোনো প্রকার বাস্তব কাজ না করেই কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে:
ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন ও ভবন নির্মাণ: নতুন স্থাপনা বা সম্প্রসারণের ভুয়া নকশা দেখিয়ে অর্থ লোপাট।
মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ (रिপেয়ারিং ও মেইনটেন্যান্স): বিভিন্ন আঞ্চলিক অফিসের ভবন, লিফট, সিঁড়িঘর এবং ছাদের প্যারাফেট ওয়াল সংস্কারের নামে ভুয়া প্রাক্কলন (Estimate) তৈরি।
বৈদ্যুতিক ও ড্রেনেজ কাজ: ড্রেন নির্মাণ ও বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন বা লাইন সংস্কারের নামে লুণ্ঠন।
অবসরের পরও অফিস ও ছায়া ঠিকাদারি: কামাল হোসেনের চাঞ্চল্যকর অধ্যায়
অধিদপ্তরের দুর্নীতির গভীরতা কতখানি, তা স্পষ্ট হয় সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি শাখা) কামাল হোসেনের কর্মকাণ্ডে।
তিনি প্রায় এক বছর আগে পিআরএল (PRL/অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটি)-এ গিয়েছেন। সরকারি বিধি অনুযায়ী পিআরএল-এ যাওয়ার পর কোনো কর্মকর্তার দাপ্তরিক ক্ষমতা বা কার্যালয় ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। কিন্তু কামাল হোসেন এখনো আগের কর্মস্থলে বহাল তবিয়তে অফিস করছেন এবং সেখানে বসেই ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো প্রকার অনুশোচনা ছাড়াই জানান, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা (পরিচালক প্রশাসন ও অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সহিদুল আমিন) তাকে অফিস করার “মৌখিক অনুমোদন” দিয়েছেন। তবে অবসরে থাকার পরও তার আর্থিক লেনদেন বা বেতন কীভাবে হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান এবং ফোন কেটে দেন।
ভুয়া বিল-ভাউচারের মেকানিজম: সামান্য গাড়ির এসিতে ৭৫ হাজার টাকা বিল
সিন্ডিকেটের টাকা ওড়ানোর একটি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের (রপ্তানি শাখা) একটি বিলের কপিতে।
নথিপত্র অনুযায়ী, একটি সরকারি গাড়ির ‘এসি কম ঠাণ্ডা হওয়া’, ‘ডান পাশের পেছনের দরজার সামান্য ডেন্ট-পেইন্ট’ এবং ‘ওয়াইপার ব্লেড’ পরিবর্তনের জন্য প্রশাসন শাখায় একটি চাহিদাপত্র পাঠানো হয়। এই সাধারণ কাজের বিপরীতে সিন্ডিকেট অবাস্তব ব্যয়ের বিল তৈরি করে:
শুধুমাত্র ডেন্ট ও পেইন্টের নামে খরচ দেখানো হয় ২৮,০০০ টাকা।
এসি মেরামতের কাল্পনিক যন্ত্রাংশের নাম করে বাকি টাকা যোগ করে সর্বমোট বিল বানানো হয় ৭৪,৭০৭ টাকা।
ত্রিমুখী স্বাক্ষরের জালিয়াত চক্র
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যান্ত্রিক বা মোটরযানের যেকোনো মেরামতের বিলে একজন কোয়ালিফাইড যান্ত্রিক প্রকৌশলীর (Mechanical Engineer) প্রত্যয়ন বা স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই সিন্ডিকেটের পাস করা কোনো বিলে কোনো প্রকৌশলীর স্বাক্ষর নেই। প্রতিটি বিলে কেবল তিনজনের স্বাক্ষর পাওয়া গেছে:
১. মেকানিক আরিফুল ইসলাম
২. সাবেক বিতর্কিত প্রটোকল অফিসার আমিনুর রহমান খান
৩. অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সহিদুল আমিন
এই তিনজনের চক্রাকার স্বাক্ষরেই রাতকে দিন আর দিনকে রাত বানিয়ে লাখ লাখ টাকার ভুয়া ভাউচার পাস করিয়ে অর্থ পকেটে পোরা হয়েছে।
নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেট
কেবল কেনাকাটা বা উন্নয়ন প্রকল্পই নয়, পরিচালক (প্রশাসন) হাবিবুল্লাহর যোগদানের পর থেকে অধিদপ্তরের মানবসম্পদ শাখায় এক বিশাল বাণিজ্য শুরু হয়েছে।
নিয়োগ বাণিজ্য: বিভিন্ন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
বদলি বাণিজ্য: মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাঙ্ক্ষিত বা ‘লাভজনক’ কর্মস্থলে পদায়নের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নির্ধারণ করা আছে, যা এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লেনদেন হয়।
দায় এড়ানোর চেষ্টা ও অভিযুক্তদের বক্তব্য
দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট নথির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্তরা কেউ সরাসরি দায় নিতে চাননি, বরং একে অপরের ওপর দায় চাপানোর কৌশল নিয়েছেন:
ইকবাল হারুন বাপ্পী (উপ-সহকারী প্রকৌশলী): নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পদের বাইরে গিয়ে কীভাবে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করছেন—এই প্রশ্নের মুখে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং বলেন, “অফিসে এসে কথা বলেন। এ বিষয়ে পরিচালক প্রশাসন ও অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সহিদুল আমিন ভালো বলতে পারবেন।”
সহিদুল আমিন (অতিরিক্ত উপ-পরিচালক): যান্ত্রিক প্রকৌশলীর স্বাক্ষর ছাড়া বিল পাসের বিষয়ে কোনো যৌক্তিক জবাব দিতে পারেননি। তবে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে পুরো দায় মহাপরিচালকের (ডিজি) ওপর চাপিয়ে বলেন, “সব বিল-ভাউচার পরিশোধের মালিক ডিজি। মহাপরিচালকের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো বিল পরিশোধ হয় না। আমার কোনো ক্ষমতা নেই। আমি একজন সৎ কর্মকর্তা, খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই বিশাল লুটপাটের কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন তহবিল ভেস্তে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এটি এই সিন্ডিকেটের দুর্নীতির সামান্য অংশ মাত্র। ভবিষ্যতে তাদের তৈরি করা আরও শত শত ভুয়া বিল-ভাউচার ও অর্থ পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য ও প্রমাণ পর্যায়ক্রমে উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এই অবস্থায় অধিদপ্তরের সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন।















