
বেনাপোল কাস্টম হাউসের আমদানি পণ্য পরীক্ষণ গ্রুপ-২, ৪ ও ৫ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফাইল জিম্মি করে ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে। আমদানি পণ্য পরীক্ষণ করতে গেলেই পণ্যের আইটেমভেদে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। টাকা ছাড়া কোনো ফাইলে স্বাক্ষর মেলে না এ কর্মকর্তার।
ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানি পণ্য পরীক্ষণের সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও তাঁর কাছে সবই ভুয়া-ভুল কাগজ বলে জাহির করেন। মূলত ফাইল আটকে রেখে চাহিদামতো ঘুষ নেওয়া তাঁর পেশায় পরিণত হয়েছে। এ কর্মকর্তার সর্বনিম্ন ঘুষের রেট ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনাকেও থোড়াই কেয়ার করেন তিনি। আমদানি পণ্য পরীক্ষণ গ্রুপ ২, ৪ ও ৫-এ তাঁর অধীনস্থ কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার যোগসাজশে ঘুষের সিন্ডিকেট তৈরি করে নানা ধরনের হয়রানি করে দৈনিক কয়েক লাখ টাকা ঘুষ আদায় করছেন বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন।
একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, আমদানি পরীক্ষণ গ্রুপ ২, ৪ ও ৫-এর অধীনস্থ বিভিন্ন শিল্পকারখানার আমদানিকৃত আইটেমের পণ্য দীর্ঘ বছর যাবৎ খালাস হয়ে থাকে। রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল যোগদানের পর থেকে নিয়মিত খালাস হওয়া এমন পণ্যের চালান পরীক্ষণ করাতে গেলেই শুরু হচ্ছে নানা সমস্যা। রাজস্ব কর্মকর্তা ও তাঁর সহকারীদের যোগসাজশে এইচএস কোড, ওজনের তারতম্য, পণ্যের শ্রেণি, ইনভয়েস ভ্যালু, মানি লন্ডারিং ইত্যাদি আপত্তি তৈরি করে হয়রানি করছেন। প্রতিটি পণ্য পরীক্ষণে ঝামেলা সৃষ্টি করছেন তিনি। এমনকি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত খালাস করা পণ্যের চালান পরীক্ষণ করাতেও পড়তে হচ্ছে নানা বিড়ম্বনায়। পূর্বে ছাড় করানো পরীক্ষণ রিপোর্ট নথিতে সংযুক্ত করলেও এ কর্মকর্তা সেটা মানতে নারাজ। উপায় না পেয়ে তাঁর দাবিকৃত ঘুষ মিটিয়ে পরীক্ষণ ফাইলে সই করাতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরীক্ষণে মাত্রাতিরিক্ত হয়রানির ফলে একাধিক সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধিরা এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন। ফ্রেশ ফাইলে পরীক্ষণে হয়রানি ও ঘুষ দাবির ফলে যেকোনো সময় পরীক্ষণ গ্রুপে আন্দোলনের রূপ নিতে পারে বলে ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারীরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের টেবিলে ফাইল গেলেই অতিরিক্ত টাকা দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও বিভিন্ন ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে ঘুষ নেওয়া তাঁর নেশায় পরিণত হয়েছে। পণ্য পরীক্ষণে ব্যাপক হয়রানিতে রাজস্ব আহরণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম পরীক্ষণের দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই শুল্ককর ফাঁকি দেওয়া একটি চক্রের সঙ্গে গোপন মিটিং করে তাঁর দায়িত্বে থাকা শেডগুলোতে নরমাল পরীক্ষণের আওতায় থাকা পণ্য ঘোষণার চালান নামিয়ে কনসাইনমেন্টপ্রতি চুক্তিতে পরীক্ষণ রিপোর্টে পণ্য খালাস পাচ্ছে। আর ফ্রেশ, স্বচ্ছ আমদানিকৃত পণ্যের চালান পরীক্ষণে তাঁর অনীহা দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। গোপন অনুসন্ধান ও নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে এ কর্মকর্তার কারসাজি ও ঘুষ বাণিজ্যের ফর্দ।
আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি শরিফুল ইসলাম জানান, তাঁর একটি আমদানিকৃত কাপ, পিরিচ ও সিরামিকের ফাইলে পরীক্ষণ রিপোর্টে ৭০ হাজার টাকা দাবি করেন রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। অগ্রিম ২০ হাজার টাকা দিলেও বিভিন্ন অজুহাত তৈরি করে তাঁর ফাইল আটকে রেখে হয়রানি করে আরও লাখ টাকা দাবি করেন। সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি শাওন ও মুকুল জানান, আমদানি মেশিনারি পরীক্ষণ ফাইলে রিপোর্ট বাবদ ১ লাখ টাকা দাবি করেন রাজস্ব কর্মকর্তা। পরে নিরুপায় হয়ে সমঝোতার মাধ্যমে ফাইলে স্বাক্ষর করিয়েছি। পরীক্ষণ গ্রুপে এলে বুঝতে পারবেন কীভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
এদিকে এক ডজন সিঅ্যান্ডএফ কর্মকর্তা জানান, রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল কাজের সময় অফিসে মোবাইল টেপেন, অথচ ফাইল নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। এ কর্মকর্তার খামখেয়ালিপনায় পরীক্ষণ গ্রুপে কর্মরত স্টাফরা অতিষ্ঠ হয়ে মালিকপক্ষ ও অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে জানিয়েছি। ব্যবসায়ীদের দাবি, রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের ঘুষ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তসহ পরীক্ষণ গ্রুপ থেকে প্রত্যাহার করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। এর আগেও এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলেও তাঁকে শাস্তির আওতায় আনা হয়নি।
এ বিষয়ে পরীক্ষণ গ্রুপের রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, তিনটি পরীক্ষণ গ্রুপের দায়িত্বে থাকায় প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি ফাইল দেখতে হচ্ছে। সিরিয়াল মোতাবেক সব ফাইল দেখে নাম ও স্বাক্ষর করে থাকি। কিছু সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি ফাইলের সিরিয়াল ভেঙে আগে নিতে চান, তাঁদের সে সুবিধা না দেওয়াতে তাঁরা মিথ্যা কথা ছড়াচ্ছেন। এতগুলো গ্রুপে কাজ করতে হিমশিম খেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাই। অর্ডার কমিশনার করে থাকেন, আমাদের কিছু করার নেই। ফাইলপ্রতি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি পরীক্ষণ গ্রুপে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানান।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার ফাইজুর রহমান বলেন, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি সন্দেহজনক চালান শতভাগ পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে বিশাল এই বন্দরের চাহিদার তুলনায় অফিসার কম থাকায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।















