
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি ও দায়িত্ব পালনে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তাঁকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, পদচ্যুতির পরও তিনি প্রকল্পের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন এবং যথাযথভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করছেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত এক আদেশে নুরুল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আদেশটির স্মারক নম্বর ১২.০০.০০০০.০৮৩.০১১.০০১৯.২৬.২৪৬। তবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরও প্রকল্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও দরপত্র কার্যক্রমে তাঁর প্রভাব থাকার অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গত ৬ সেপ্টেম্বর আহ্বান করা একটি বড় দরপত্রকে ঘিরে নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ওই দরপত্রের নোটিশ আইডি দেখিয়ে বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া এবং তাঁদের পছন্দের কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অর্থ লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের লিখিত বক্তব্য এই প্রতিবেদনের ভিত্তি হিসেবে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
একই সময়ে নিজের বদলি ঠেকাতে বিভিন্ন মহলে তদবির চালানোর অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
বিএডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতির পর সংস্থার চেয়ারম্যান ও প্রধান প্রকৌশলী তাঁকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন না করে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ সেপ্টেম্বর আহ্বান করা দরপত্রে প্রায় ২৫০টি নির্মাণকাজ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এসব কাজের মধ্যে বেশ কিছু কাজের জন্য নুরুল ইসলামের পছন্দের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আগাম অনলাইন দরপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দরপত্র জমাদানের সময়, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা, বিড ডকুমেন্ট, দরপত্র মূল্যায়ন নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও পূর্ববর্তী কাজের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের আরও অভিযোগ, দরপত্রের নোটিশে যেসব খাল পুনঃখননের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি ইতোমধ্যে পুনঃখনন করা হয়েছে। আবার কিছু দরপত্র আইডির বিপরীতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নেই বলেও দাবি করেছেন তাঁরা।
এ ছাড়া ৫০ গ্রুপ মালামাল সরবরাহের কাজ নিয়েও অনিয়মের পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি, সংশোধিত বরাদ্দ, প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন, দরপত্র নথি এবং বাস্তব কাজের পরিমাণ মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২১ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের পিএসসি সভায় প্রকল্পটির দরপত্র গ্রহণের সময় আরও ১৫ দিন বাড়ানোর বিষয়ে মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপরও দরপত্র গ্রহণের সময় বাড়ানোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি বা সংশোধিত সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
ফলে দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দরপত্রের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে লিখিত আদেশ বা সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বিএডিসির নথিপত্রের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২১ সালে মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায়, ওই বছরের ২০ জুন নুরুল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য উৎকোচ গ্রহণ এবং প্রকল্পের গাড়ি সরবরাহের কাজে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিজেই জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এসব অভিযোগের পর তাঁকে হবিগঞ্জ অঞ্চলে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তবে ওই সময়কার অভিযোগের বিষয়ে কোনো আদালতের রায় বা চূড়ান্ত তদন্ত-সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যাচাই করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পরবর্তী সময়ে হবিগঞ্জে কর্মরত অবস্থায় নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অফিস ভবন নির্মাণের কাজে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিম্নমানের কাজ করার অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে বিএডিসির অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তদন্ত প্রতিবেদনে ভবন নির্মাণের প্রায় ৩৬টি খাতে অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবেদনে ভবনের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরপরই হাত লাগালে প্লাস্টার খসে পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। ভবনের বাইরের অংশে ব্যবহৃত সিরামিকও খসে পড়ার অভিযোগ ছিল।
এ ছাড়া নিম্নমানের বৈদ্যুতিক পণ্য ব্যবহার এবং কিছু কাজ শেষ না করেই নথিপত্রে তা সম্পন্ন দেখানোর বিষয়ও তদন্তে উঠে আসে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রশাসনিক বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে হবিগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
পরবর্তী সময়ে নুরুল ইসলামকে চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং একই সঙ্গে ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বিএডিসির কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, আগের কর্মস্থলগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও বদলি ছাড়া কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই নুরুল ইসলাম বারবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন।
তবে প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় নুরুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।
তাঁদের অভিযোগ, প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানকারী কর্মকর্তা একই সঙ্গে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। নুরুল ইসলাম নিজেই দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
এ ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি, সংশ্লিষ্ট দরপত্রের কমিটি গঠনের আদেশ এবং প্রকল্পের প্রশাসনিক কাঠামো পর্যালোচনা করে বিষয়টি বিধিসম্মত ছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
নথিপত্র অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সম্প্রতি একসঙ্গে প্রায় ২৫০টি উন্নয়নকাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
বিএডিসির কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত বড় প্রকল্পের উন্নয়নকাজ পর্যায়ক্রমে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক কাজ শুরু হলে প্রকল্পের জনবল, তদারকি সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
তাঁদের দাবি, চট্টগ্রামে একসঙ্গে প্রায় ৩০০টি কাজের দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ফলে কাজের সংখ্যা, প্রকল্পের অনুমোদিত লক্ষ্যমাত্রা, বরাদ্দ এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার মধ্যে সামঞ্জস্য ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের আরও দাবি, নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মস্থলে বর্তমানে তিনটি দুর্নীতি মামলা চলমান রয়েছে। তবে মামলাগুলোর নম্বর, আদালতের নাম, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ধারা এবং সর্বশেষ বিচারিক অবস্থার নির্ভরযোগ্য নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
অতএব, এসব মামলার বিষয়ে আদালতের নথি বা সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
নুরুল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পরও তিনি প্রকল্পের কোনো সিদ্ধান্ত বা দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে ৬ সেপ্টেম্বরের দরপত্রে আগাম দরপত্র জমা দেওয়ার অভিযোগ, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ, পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা, পুনঃখনন করা খালের জন্য আবার দরপত্র আহ্বান, পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছাড়া কোনো কাজের দরপত্র আহ্বান এবং ৫০ গ্রুপ মালামাল সরবরাহের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ—সবগুলো বিষয় পৃথকভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁদের মতে, এ ক্ষেত্রে দরপত্রের নথি, ই-জিপি তথ্য, বরাদ্দপত্র, ডিপিপি, মাঠপর্যায়ের কাজের বাস্তব অবস্থা, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কৃষি মন্ত্রণালয়ের আদেশে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির পর নুরুল ইসলামের হাতে প্রকল্পের কোনো প্রশাসনিক বা আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল কি না। যদি না থাকে, তাহলে তাঁর নির্দেশ বা প্রভাবের ভিত্তিতে প্রকল্পের কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।















