একই আন্দোলনে কারও শাস্তি মওকুফ, কারও লঘুদণ্ড—১০-১২ জনকে কেন বাধ্যতামূলক অবসর?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস, ইনকাম ট্যাক্স ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঐক্য পরিষদের আন্দোলনকে ঘিরে নেওয়া বিভিন্ন প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে একই আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে একদলকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি বা লঘুদণ্ড দেওয়া হলেও অন্যদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, আন্দোলনে অংশ নেওয়াকে যদি শাস্তির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে, তাহলে একই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অন্যদের ক্ষেত্রে কেন একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলো না—এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। তাদের দাবি, ব্যক্তিভেদে অভিযোগ ও প্রমাণ পৃথক হলে তা সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হোক। অন্যথায় বাধ্যতামূলক অবসরের আদেশগুলো পুনর্বিবেচনা করে তাদের চাকরিতে পুনর্বহাল করা হোক।

একই আন্দোলনে শাস্তির ভিন্নতা কেন?
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, একই ব্যানারের অধীনে অনুষ্ঠিত আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কারও ক্ষেত্রে শাস্তি মওকুফ হয়েছে, কাউকে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, আবার কয়েকজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে মামলা কিংবা প্রশাসনিক বদলির মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এ অবস্থায় বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্তদের প্রশ্ন-একই কর্মসূচি ও একই আন্দোলনের ক্ষেত্রে শাস্তির মানদণ্ড কী ছিল?

তাদের মতে, যদি কারও বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া, শৃঙ্খলাভঙ্গ, সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি বা অন্য কোনো গুরুতর অভিযোগ থাকে, তাহলে সেই অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, তদন্তের ফলাফল ও প্রমাণ প্রকাশ করা উচিত। কারণ শুধু একই আন্দোলনে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ব্যক্তি ভেদে এত বড় শাস্তির পার্থক্য তৈরি হলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

২৫ বছরের বেশি চাকরি করেও কেন মাত্র কয়েকজন?
বাধ্যতামূলক অবসর নিয়ে বিতর্কের আরেকটি বিষয় হলো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির মেয়াদ।
ভুক্তভোগীদের দাবি, কাস্টমস ও ইনকাম ট্যাক্স বিভাগের আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ২৫ বছরের বেশি চাকরি করা কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র প্রায় ১০ থেকে ১২ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ নিয়ে অবসরপ্রাপ্তদের প্রশ্ন, ২৫ বছরের বেশি চাকরির মেয়াদ থাকাই যদি বাধ্যতামূলক অবসরের ক্ষেত্রে কোনো বিবেচ্য বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে একই ধরনের চাকরির মেয়াদসম্পন্ন অন্যদের ক্ষেত্রে কেন একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি?

আর যদি প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আলাদা ও গুরুতর অভিযোগ থাকে, তাহলে সেই অভিযোগগুলো কী ছিল এবং তদন্তে কী প্রমাণ পাওয়া গেছে-তা প্রকাশ করা হোক।

যাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে
বিভিন্ন সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য মোঃ আব্দুর রউফ খান, সদস্য মোঃ হোসেন আহমেদ, কাস্টমসের সদস্য মোঃ আলমগীর হোসেন, ইনকাম ট্যাক্সের সেকেন্ড সেক্রেটারি সায়্যেদা নাসরিন আক্তার লুনা, এনবিআরের কর পরিদর্শক লোকমান হোসেন, ইনকাম ট্যাক্সের আব্দুর রহিম রানা এবং কাস্টমসের মো. সালেক খানসহ আরও কয়েকজন রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, তারা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো অপরাধ বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে থাকে, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু আন্দোলনে অংশগ্রহণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৈষম্যমূলকভাবে তাদের চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়ে থাকলে সেটি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।

চাকরিতে ফিরে যাওয়ার আবেদন
বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্তদের কয়েকজনের দাবি, তারা ইতোমধ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে তাদের আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছেন।
তাদের প্রত্যাশা, প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে পৃথকভাবে অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন, প্রমাণ ও আইনগত ভিত্তি যাচাই করা হবে। কোনো কর্মকর্তা যদি নির্দোষ হন কিংবা তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ যথাযথভাবে প্রমাণিত না হয়, তাহলে বাধ্যতামূলক অবসরের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হবে।

তাদের মতে, দীর্ঘ চাকরিজীবনের পর এমন একটি সিদ্ধান্ত শুধু একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পেশাগত জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর প্রভাব তার পরিবার ও ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার ওপরও পড়ে।

‘বেছে বেছে শাস্তি’ দেওয়া হয়েছে কি না, তদন্তের দাবি
ভুক্তভোগীদের একটি অংশের অভিযোগ, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে নির্দিষ্ট কয়েকজনকে বেছে নিয়ে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে প্রশাসনিক কারণের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিরোধ বা অন্য কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগত বক্তব্যের পাশাপাশি সরকারি নথি, তদন্ত প্রতিবেদন, শাস্তির আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একই ধরনের ঘটনায় শাস্তির মাত্রায় বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের কারণ স্পষ্ট থাকা উচিত। অভিযোগের ধরন, প্রমাণের শক্তি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

পুনর্বহালের মাধ্যমে সমাধানের প্রত্যাশা
বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, তারা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না। তারা চান তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্তটি ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষভাবে পুনর্বিবেচনা করা হোক।
তাদের বক্তব্য, যদি তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা বহাল থাকতে পারে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কিংবা একই আন্দোলনে অংশ নেওয়া অন্যদের তুলনায় তাদের ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি দেওয়া হয়ে থাকলে, বাধ্যতামূলক অবসরের আদেশ প্রত্যাহার করে চাকরিতে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।

একই সঙ্গে ২৫ বছরের বেশি চাকরি করা শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে কেন মাত্র ১০-১২ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলো, সেই প্রশ্নেরও পরিষ্কার উত্তর দাবি করেছেন তারা।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে-বিপক্ষে নয়; বরং প্রশাসনিক ন্যায়বিচার, সমতা ও স্বচ্ছতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হবে। বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্তদের প্রতিটি আদেশ পুনর্বিবেচনা করে প্রকৃত অভিযোগ ও প্রমাণ যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দীর্ঘদিনের এই বিতর্কের অবসান হতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।