লাইব্রেরিয়ান বনাম পাইলট

একজন লাইব্রেরিয়ান বসিয়া আছেন তাহার লাইব্রেরিতে। তিনি অতি সিরিয়াস লাইব্রেরিয়ান। একদিন এক যুবক আসিয়া বলিল, ‘ভাই, একটা চিকেনর বার্গার আর কোক হবে?’ লাইব্রেরিয়ান রাগে লাল হইয়া চশমার ফাঁক দিয়া চোখ বড় করিয়া ধমকের সুরে বলিলেন, ‘আপনার কি মনে হয় এইটা স্ন্যাকসের দোকান? এইটা লাইব্রেরি। এইখানে খাবার পাওয়া যায় না!’ কিছুক্ষণ পর এক বৃদ্ধা আসিয়া বলিলেন, ‘বাবা, আমার চশমাটা কি এইখানে ফেলিয়া গিয়াছি?’ লাইব্রেরিয়ান মুখ গম্ভীর করিয়া বলিলেন, ‘ভিতরে দেখুন কোনো বইয়ের মধ্যে রাখিয়া গিয়াছেন কি না।’ কিছুক্ষণ খুঁজিয়া বৃদ্ধা বাহির হইয়া বলিলেন, ‘বইয়ের ভিতরে তো চশমা নাই; কিন্তু ভিতরে একগাদা বোর্ড দেখিলাম তাহাতে লেখা রহিয়াছে সাইলেন্স! উহাও কি পড়িবার জন্য?’ লাইব্রেরিয়ানের ধৈর্যচ্যুতি ঘটিল। তিনি সদর দরজা দ্রুত বন্ধ করিয়া সরিয়া পড়িলেন। পাছে কেহ আসিয়া জিজ্ঞাসা করেন, এইখানে কি ঘুমের ঔষধ পাওয়া যায়! ইহা বিস্তর ফারাক পেশার বিড়ম্বনা লইয়া একটি রসিকতা।

তবে রসিকতা বাস্তবে রূপ লইলেই বিপদ! এই ধরনের পেশাগত ফারাকের বিড়ম্বনা ভাবিতে পারে নাই আমাদের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টজন। লাইব্রেরিয়ানের কাজ ঘুমের ঔষধ বিক্রয় না হইলেও তিনি যে পাইলটের যোগ্য দায়িত্ব পালন করিবার সুযোগ পাইতে পারেন তাহা বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কৃত একটি ঘটনার দিকে তাকাইলে প্রমাণ মিলিবে। পত্রিকান্তরে সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে, একজন লাইব্রেরিয়ানকে অপারেশন ইন্সপেক্টরের পদে বসানো হইয়াছে! অর্থাৎ পাইলটদের ফ্লাইট লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও ফ্লাইট সেফটি তদারকির কাজ। পদটির নাম শুনিলেই বুঝা যায়, ইহা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি পদ এবং এই ক্ষেত্রে যথাযথ অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নাই। লাইব্রেরিয়ান পদটি মোটেই অসম্মানজনক নহে; কিন্তু অ্যাভিয়েশনের পেশার সহিত লাইব্রেরিয়ানের পেশার যে জানা গিয়াছে, নিয়ম অনুযায়ী একজন ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টরের ৫ হাজার ঘণ্টা আকাশে উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা থাকিতে হয়। যাত্রী হিসাবে নহে পেশাদার হিসাবে। তাহাকে বৈধ লাইসেন্সধারী পাইলট হইতে হয়। আন্তর্জাতিক নিয়মেও তাহাই; কিন্তু মোহন সিরিজের গোয়েন্দা কাহিনির মতো কী দিয়া কী হইয়া গিয়াছে তাহা কেহই বলিতে পারিতেছেন না। এই ঘটনা খোদ কর্তৃপক্ষকেও বিব্রত করিয়াছে।

কাজটি যে কোনো ক্রমেই ঠিক হয় নাই উহা তাহারাও বলিতেছেন, আমরাও মনে করি; কিন্তু সকল কিছু সঠিকভাবে হইবার পরিবেশ তো এখনো নাই। আমরা আশা করিব, এহেন বিব্রতকর পদায়ন যেন কোনো ক্ষেত্রেই না হয়। দেশে নতুন একটি সরকার আসিয়াছে। যে কোনো স্বাভাবিক সরকারই তাহাদের দক্ষতার ব্যাপারে স্বাক্ষর রাখিতে চায়। বর্তমান সরকারও নিশ্চয়ই চাহে। সরকারের মাত্র অল্প কয়েক দিন অতিবাহিত হইলেও সকালের সূর্যটা মন্দ দেখা যাইতেছে না। এই ধারা অব্যাহত রাখিয়া সরকারকে সামনের দিনগুলিতে দক্ষতার পরিচয় দিতে হইবে; কিন্তু জব্বার ঘরামির কাজ আছিরুদ্দিন লবণ ব্যাপারীর ঘাড়ে পড়িলে সরকারের কর্ম বিঘ্ন হইতে বাধ্য, পরিকল্পনা যতই সুচিন্তিত হউক। তাই নিয়োগ পদায়নের সকল স্তরে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যেন সুনজরে থাকে এবং মেইনটেইন করা হয়। উহা লক্ষ রাখা সরকারের জন্যই সুফল বহিয়া আনিবে।