
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় দাপ্তরিক চিঠিপত্র ও ফাইল যথাসময়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন না করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যান ও সদস্যদের স্বাক্ষরিত কিংবা নির্দেশনাসংবলিত গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্রও সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছানোর পর দীর্ঘদিন পড়ে থাকে। ফলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অযথা বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এনবিআর চেয়ারম্যানের দপ্তরের বিভিন্ন শাখায় বিপুলসংখ্যক ফাইল ও চিঠিপত্র এলোমেলোভাবে পড়ে থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের প্রাথমিক অনুমোদন বা ইনিশিয়াল দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট নথি দ্রুত পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য শাখায় পাঠানো হলেও তা যথাসময়ে নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন দায়িত্বশীল সৎ কর্মকর্তা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র যথাসময়ে উপস্থাপন না হলে শুধু প্রশাসনিক জটিলতাই তৈরি হয় না, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও বিলম্ব হতে পারে। তার অভিযোগ, কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যক্তিগত সুবিধা বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরির উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কোনো চিঠিপত্র কার সাথে টেকনিক্যালভাবে আটকে রাখেন।
অন্যদিকে, এনবিআরের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা বলেন, চিঠি পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট ফাইলে উপস্থাপন করা এবং পরবর্তী কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো দাপ্তরিক শৃঙ্খলার মৌলিক অংশ। কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিঠি দিনের পর দিন বা মাসের পর মাস পড়ে থাকার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
তিনি বলেন, বর্তমান চেয়ারম্যানের উচিত এনবিআরের গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলো আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করা এবং প্রতিদিনের ডাক ও চিঠিপত্র প্রতিদিনই সংশ্লিষ্ট ফাইলে উপস্থাপন হচ্ছে কি না, তা সরাসরি তদারকি করা। একই সঙ্গে কোন চিঠি কত তারিখে এসেছে, কখন ফাইলে উপস্থাপন হয়েছে এবং বর্তমানে কার কাছে রয়েছে—এসবের একটি কার্যকর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে কাস্টমস ও আয়কর বিভাগের কর্মকর্তা কিংবা ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্বার্থের কারণে ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিঠিপত্র আটকে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরনের সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীরা প্রতিদিন শাখায় তদবিরে ব্যস্ত থাকেন। এটি একটি টেনশন, সময় নষ্ট, কষ্ট ও দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। যদি অনৈতিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শাখায় এ ধরনের কার্যক্রম চলে, তাহলে ডিপার্টমেন্টের মান-সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়া ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান এনবিআরকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার চেষ্টা করছেন বলে তিনি মনে করেন। তবে দপ্তরের অভ্যন্তরে চেয়ারম্যান যদি দাখিলকৃত নথিপত্রের ব্যবস্থাপনা ও চিঠিপত্র উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি হয়ে থাকে, সেটি চেয়ারম্যানের নজরে আনা জরুরি। ভুক্তভোগীরা হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এবং চেয়ারম্যানের অজান্তে কোনো চিঠি যদি মাসের পর মাস শাখায় পড়ে থাকে, তবে সে দায়িত্ব রয়েছে শাখা সহকারীদের। তাহলে সেটি শুধু কর্মচারীর অবহেলা নয়—পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জন্যই একটি সতর্ক সংকেত।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একটি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি কেন দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস, অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র শাখায় পড়ে থাকবে? চিঠি গ্রহণ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, শাখা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপনের প্রতিটি ধাপে যদি চেয়ারম্যানকে তদারকি করতে হয়, তাহলে শাখা সহকারী কেনই বা রয়েছেন? জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য চেয়ারম্যান মহোদয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাহলে এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।
জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে রয়েছে—
প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় আকস্মিক পরিদর্শন ও নথি যাচাই;
প্রতিদিনের ডাক ও চিঠি একই কর্মদিবসে সংশ্লিষ্ট ফাইলে উপস্থাপন বাধ্যতামূলক করা;
কোনো চিঠি কতদিন শাখায় পড়ে আছে, তার ডিজিটাল বা লিখিত রেজিস্টার সংরক্ষণ;
নির্ধারিত সময়ে চিঠি উপস্থাপন না করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা;
চেয়ারম্যান ও সদস্যদের স্বাক্ষরিত চিঠিপত্রের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ;
দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্পন্ন নথির তালিকা তৈরি করে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া;
ইচ্ছাকৃতভাবে চিঠি বা ফাইল আটকে রেখে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এনবিআরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা গাফিলতির কারণে সরকারি চিঠিপত্র আটকে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় না, রাজস্ব প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব মহোদয় অভিযোগগুলো কতটা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোতে সরেজমিন তদারকি, নথি যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা চিঠিপত্র দ্রুত উপস্থাপন ও নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর নির্দেশনা দেওয়া হয় কি না, সেটিও এখন সংশ্লিষ্টদের নজরে রয়েছে।
সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথি আটকে রেখে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যেন ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ না পান এবং “আজকের চিঠি আজই ফাইলে”—এই নীতিতে এনবিআরের নথি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়, এমন একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কর্তৃপক্ষের—তারা এ আশা ব্যক্ত করেন।
বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও গণভুক্তভোগীরা ব্যক্ত করেন, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাটের বিভিন্ন বিভাগ ও সার্কেলে অসংখ্য বহিরাগত রয়েছেন। বহিরাগতদের কারণে ব্যবসায়ী মহল হয়রানির শিকার হচ্ছে এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব হারাচ্ছে। তাদের সিন্ডিকেটের কারণে এ সমস্ত বহিরাগত অবৈধভাবে অফিসে যাতে না আসতে পারে, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিষ্পত্তির দাবি জানান তারা। যাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেন, সে জন্য এ সমস্ত বিষয়ে চেয়ারম্যান মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।















