
বরিশাল গণপূর্ত বিভাগে দুর্নীতির একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন হিসাব সহকারী আবুল হাসান রূপক। অবৈধ সম্পদ আড়াল করতে নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে ‘ভাবী’ পরিচয় দিয়ে অস্বীকার করার মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। টানা ১৬ বছর একই দপ্তরে কর্মরত থেকে সাবেক স্বৈরাচারী সরকার ও বর্তমান রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এখন কোণঠাসা এই কর্মকর্তা।
স্ত্রীকে অস্বীকার ও বিপুল সম্পদ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপক তার অবৈধ আয়ে বরিশাল ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও দোকান ক্রয় করেছেন। জর্ডান রোডে দুটি ফ্ল্যাট, ঢাকায় দুটি ফ্ল্যাট, রূপাতলী ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে জমি এবং বাড়ি রয়েছে তার। এসব সম্পদের বড় অংশই তার স্ত্রী নারগিস হাসানের নামে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে এলে রূপক দাবি করেন, নারগিস হাসান তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী। তবে প্রাপ্ত দলিলাদি ও তথ্যপ্রমাণ বলছে, নারগিস হাসানই তার প্রকৃত স্ত্রী। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত এড়াতে এবং অবৈধ সম্পদ রক্ষা করতেই তিনি স্ত্রীকে অস্বীকার করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের ১২ নং স্টল বরাদ্দ নিয়ে বেআইনিভাবে ভাড়া দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের অভিযোগও রয়েছে এই দম্পতির বিরুদ্ধে।
ঠিকাদারদের হয়রানি ও বিল আত্মসাতের ফাঁদ
বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। মেসার্স গাজী বিল্ডার্স এর স্বত্বাধিকারী মো: আল মামুন অভিযোগ করেন, শেবাচিম হাসপাতালের সংস্কার কাজ (আইডি: ১১১৪৩৫১) সম্পন্ন করার পরও ৯ লাখ ৪৯ হাজার ৭৯১ টাকার বিল পাননি তিনি। রূপকের চাহিদা অনুযায়ী কমিশন না দেওয়ায় তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, রূপক ও নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম মিলে জুন মাসে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেন। পিপিআর আইন অনুযায়ী ৩০ জুনের মধ্যে বিল পরিশোধের নিয়ম থাকলেও, রূপক তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অডিট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এই অর্থ আত্মসাৎ করেন।
প্রকৌশলী-হিসাব সহকারী সিন্ডিকেট
অভিযোগে জানা গেছে, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন ওসমান গণী থেকে শুরু করে বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম পর্যন্ত সবার সাথেই গড়ে তুলেছেন ঘনিষ্ঠ সখ্য। ফয়সাল আলমকে সাবেক সরকারের প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত করে বলা হচ্ছে, তার প্রশ্রয়েই রূপক এখন অপ্রতিরোধ্য।
মেসার্স গাজী বিল্ডার্সকে দেওয়া এক লিগ্যাল নোটিশের জবাবে বিভাগীয় দপ্তর থেকে জানানো হয়, বরাদ্দ না থাকায় বিল পরিশোধ সম্ভব হয়নি। তবে অভিজ্ঞ ঠিকাদারদের মতে, এক অর্থবছরের টাকা অন্য অর্থবছরে এভাবে আটকে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এটি মূলত টাকা আত্মসাতের একটি কৌশল।
অভিযোগের পাহাড় ও তদন্তের দাবি
হিসাব রক্ষক আলমগীর হোসেন, ক্যাশিয়ার মঞ্জুর কাদির এবং রূপকের এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেই দুদক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা। মেজারমেন্ট বুকে কাজ বাড়িয়ে দেখানো, একই দেয়াল বারবার দেখিয়ে বিল উত্তোলন এবং অডিট কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ এখন বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নিত্যদিনের চিত্র।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আবুল হাসান রূপক সকল অভিযোগ অস্বীকার করলেও নথিপত্র এবং ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাধারণ ঠিকাদার ও সচেতন মহল এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।















