অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজে কেলেঙ্কারি: বহাল তবিয়তে সাবেক সিইও সুলতান আহমেদ

অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির বিদেশি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজের সাবেক সিইও সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও তিনি এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। মালয়েশিয়ায় কর্মরত থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার তথ্য উঠে এসেছে ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুলতান আহমেদসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নিয়োগ নীতিমালা লঙ্ঘন করে নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়ায় অবস্থান, অবৈধভাবে চিকিৎসা ও শিশু শিক্ষাভাতা গ্রহণ, প্রতিষ্ঠানের অর্থে ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি ও টোল বিল পরিশোধের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, সুলতান আহমেদ ভ্রমণ ব্যয়ের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। পাশাপাশি দোকানভাড়া বাবদ পাওয়া অর্থও ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজে দায়িত্ব পালনকালে এসব অনিয়মের বিষয়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় বিস্তারিত তথ্য উঠে এলেও তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অগ্রণী রেমিট্যান্স হাউজ এসডিএন বিএইচডি, মালয়েশিয়ায় অনিয়মের ৭টি অডিট আপত্তিতে উঠে এসেছে ১ লাখ ২৪ হাজার ১শ’ ৬৮ দশমিক ৩৭ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের অনিয়মের তথ্য। এর মধ্যে প্রথমে ৪৬ হাজার ৬শ’ ৪১ রিঙ্গিত আদায় হয়। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের চাপে বাকী অর্থও পরিশোধে বাধ্য হন তিনি ও অপকর্মের সহযোগিরা। সাবেক সিইও ও পরিচালক সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে একাই ৫২ হাজার ৯শ’ ৪৩ রিঙ্গিতের অনিয়মের দায় পাওয়া গেছে। এছাড়া সাবেক সিইও খালেদ মোরশেদ রিজভীর বিরুদ্ধে ১৬ হাজার ৫শ’ ৮৪ রিঙ্গিত, সাবেক সিইও লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে ৬ হাজার রিঙ্গিত এবং সাবেক সিইও ওয়ালী উল্লাহর বিরুদ্ধে দুই হাজার রিঙ্গিত আত্মৎসাতে জড়িত থাকার তথ্য উঠে এসেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সুলতান আহমেদের অনিয়মের ধরণ বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে পরিবার নেওয়ার বিধান না থাকলেও তিনি তা মানেননি। দুই তিন মাসের মধ্যে পরিবার মালয়েশিয়ায় নিয়ে এসে অনৈতিকভাবে চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষা ভাতা গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি ও টোল বিল পরিশোধ করেছেন প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে। নতুন শাখা খোঁজার নামে ভ্রমণ ব্যয় দেখানো হলেও তার পে- প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। দোকানভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট হিসেবে জমা না করে সিইও সুলতান তার নিজ পকেটে রেখে ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে শাখা পরিদর্শনের নামে পরিবহন ব্যয়, যথাযথ অনুমোদন ছাড়া প্রশিক্ষণ ব্যয় এবং বোর্ড সভার উপস্থিতি ভাতা গ্রহণে নির্ধারিত নীতিমালা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুধু বোর্ডসভা ভাতা খাতে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের পরিমাণই ৩০ হাজার রিঙ্গিত, যা বাংলাদেশি টাকায় (এক রিঙ্গিত সমান ত্রিশ টাকা ধরে) নয় লাখেরও বেশি।

জানা যায়, নিরীক্ষা চলাকালীন ও নিরীক্ষা পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু অর্থ জমা দিয়েছেন সুলতান আহমেদ। খাত বিষেশজ্ঞদের মতে, ব্যাংকিং খাতের অর্থ অন্যায়ভাবে নিজের পকেটে রেখে আপত্তির মুখে ফেরত প্রদান করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি তহবিল তছরুপের মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
জান যায়, এসব তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ার পর সুলতান আহমেদকে অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজ মালয়েশিয়া থেকে ঢাকা অফিসে ফিরিয়ে আনা হয়।

এসব বিষয়ে জানতে সুলতান আহমেদকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়গুলো অনেক আগেই সেটেল হয়ে গেছে। এছাড়া অফিসিয়ালিও কিছু আপত্তি উত্থাপিত হয়েছিল এর জন্য যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল আমরা তা যথানিয়মে পালন করেছি।

সুলতান আহমেদসহ অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের ব্যাপারে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কিনা, এই ব্যাপারে জানতে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তাই তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।