হবিগঞ্জের বাল্লা শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা হারুনের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ

দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও শুল্ক স্টেশনে কর্মরত কিছু অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘বিশেষ সমঝোতার’ মাধ্যমে চোরাচালানি পণ্য ছাড়, ঘুষ বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নতুন নয়। এবার এমনই একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের রাজস্ব কর্মকর্তা শেখ হারুনুর রশিদের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমের কাছে পাঠানো একটি লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, বর্তমানে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা শুল্ক স্টেশনে কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তা শেখ হারুনুর রশিদ দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, দুর্নীতি, চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, শেখ হারুনুর রশিদের জন্ম ১৯৮০ সালে খুলনা সদরে। তিনি খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং শেখ মো. আসাদুজ্জামানের ছেলে। ২০০৪ সালে তিনি কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে সিপাহী পদে চাকরিতে যোগদান করেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং একটি শক্তিশালী চোরাচালান সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন।
বিভিন্ন সময়ে ‘বিশেষ সমঝোতার’ মাধ্যমে চোরাচালানি পণ্য ছাড়, রাজস্ব ফাঁকি এবং ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ দায়ের হয়েছিল, তবে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে সেসব অভিযোগ কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি। চাকরিজীবনের মাত্র দুই দশকেই তিনি নিজের ও পরিবারের ভাগ্যের চাকা আমূল বদলে দিয়েছেন।

একজন নবম গ্রেডের রাজস্ব কর্মকর্তার বৈধ আয়ে এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া কতটা সম্ভব—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, খুলনা শহরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বি.কে. ইস্ট লেনে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে তিনি একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির ৪ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর বাড়িতে নিজের নামে একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন।

আইনের চোখ ফাঁকি দিতে শেখ হারুনুর রশিদ তার অধিকাংশ সম্পদ নিজের নামে না রেখে পিতা শেখ মো. আসাদুজ্জামান, মা শিরীন জামান, স্ত্রী সুলতানা আক্তার, সন্তান এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের নামে ক্রয় করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ব্যাংক হিসাব তদন্ত করলেই এই বিপুল অবৈধ সম্পদের আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে।

অবৈধ পথে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও নিজ গ্রামের বাড়িতে দান-সদকার জন্য শেখ হারুনুর রশিদের বেশ সুনাম রয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তারা জানান, তিনি প্রায়ই গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন, একজন নবম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ দান-সহায়তা করার সক্ষমতা অর্জন করলেন?

কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শেখ হারুনুর রশিদ বাইরে থেকে অত্যন্ত ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের মনে হলেও বাস্তবে তিনি অর্থ ছাড়া কিছু বোঝেন না। অতীতেও তার বিরুদ্ধে একাধিকবার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও প্রভাব ও অর্থের জোরে তিনি সেগুলো ধামাচাপা দিয়েছেন। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দুদক সাধারণত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কাজ করে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাজস্ব কর্মকর্তা শেখ হারুনুর রশিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব দেননি।