
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ জালিয়াতি থেকে শুরু করে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ—দুর্নীতির এমন কোনো স্তর নেই যেখানে হাত দেননি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৮ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তালেব। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও ক্যাডার পরিচয় ধারণ, জ্যেষ্ঠতা জালিয়াতি এবং মাঠপর্যায়ে কোনো কাজ না করেই কোটি কোটি টাকার বিল তুলে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া এক সাম্প্রতিক অভিযোগে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি একাধিক খাতের অন্তত ১৬টি প্রকল্পে কোনো কাজ না করেই ৫ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরাসরি আত্মসাৎ করেছেন। কেবল তাই নয়, প্রতিটি প্রাক্কলন (এস্টিমেট) অনুমোদনের আগেই ১০ শতাংশ কমিশন নিশ্চিত করা এবং নিজস্ব সিন্ডিকেটের বাইরে কাউকে কাজ না দেওয়ার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অপূরণীয় ক্ষতি করে চলেছেন।
পরীক্ষা ছাড়াই ‘ক্যাডার’: এক নজিরবিহীন জালিয়াতি
ক্যাডার না হয়েও নির্বাহী প্রকৌশলী আবু তালেবের উত্থানের গল্পটি সিনেমাটিক হলেও এর পরতে পরতে রয়েছে জালিয়াতির ছাপ। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি কোনো বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবে অবৈধভাবে ক্যাডার পদে নিয়োগ পান। এখানেই ক্ষান্ত হননি তিনি; ২৭তম বিসিএস কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে জ্যেষ্ঠতা অর্জন করেন এবং দ্রুততম সময়ে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। একজন নন-ক্যাডারের এভাবে ক্যাডার পরিচয়ে পদোন্নতি পাওয়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও ন্যাক্কারজনক ঘটনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
১৬ হাসপাতালে ‘কাজ না করেই’ শতভাগ বিল উত্তোলন
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দকৃত অর্থের ১৬টি উন্নয়ন ও মেরামত কাজে আবু তালেবের দুর্নীতির সবচেয়ে নগ্ন চিত্র ফুটে ওঠে। নিয়ম অনুযায়ী ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করে বিল পরিশোধের কথা থাকলেও তিনি কোনো কাজ সম্পন্ন না করেই ঠিকাদারদের যোগসাজশে পুরো বিল তুলে নিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল: ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট: ৫৬.৩ লাখ টাকা
ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট: ৩৬.১২ লাখ টাকা
সরেজমিনে এসব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেছে, নথিপত্রে কাজ সমাপ্ত দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো সংস্কার কাজই করা হয়নি। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ ১৬টি প্রতিষ্ঠানের মেরামত কাজের সম্পূর্ণ অর্থই এভাবে হরিলুট করা হয়েছে।
জালিয়াতির আশ্রয় ও ‘কমিশন রাজ’
কাজ না করে বিল উত্তোলনের বিষয়টি গোপন করতে আবু তালেব আশ্রয় নিয়েছেন নথিপত্র জালিয়াতির। কাজ শেষ হয়েছে এমন মর্মে ‘ব্যাকডেটেড’ বা পূর্ববর্তী তারিখের ভুয়া প্রত্যয়নপত্র তৈরি করে নথিতে যুক্ত করেছেন তিনি, যা সরকারি ক্রয় আইন (PPR) এবং দণ্ডবিধির চরম লঙ্ঘন। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একটি অংশকে ম্যানেজ করে তিনি দিনের পর দিন এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো ঠিকাদার এর প্রতিবাদ করলে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করার হুমকি দেওয়া হয়।
পাশাপাশি, গণপূর্তের ই/এম বিভাগ-৮ এ আবু তালেব কায়েম করেছেন ‘কমিশন রাজ’। প্রতিটি প্রাক্কলন অনুমোদনের আগেই তাকে ১০ শতাংশ নগদ কমিশন দিতে হয়। তার নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যার বাইরে কোনো সাধারণ ঠিকাদারের পক্ষে কাজ পাওয়া অসম্ভব। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি গত কয়েক বছরে রাষ্ট্রের শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান:
“আবু তালেবের লাগামহীন দুর্নীতির কারণে সৎ ব্যবসায়ীরা আজ ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তার সিন্ডিকেটের বাইরে কারও কোনো সুযোগ নেই।”
আয়ের তুলনায় শতগুণ সম্পদ, খোঁজে নামছে সংস্থাগুলো
একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও আবু তালেবের জীবনযাপন অত্যন্ত বিলাসবহুল। অবৈধ নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনি তার বৈধ আয়ের তুলনায় কয়েকশ গুণ বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ও এর আশপাশে তার নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট এবং বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তার এই সম্পদের উৎস খুঁজতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে বিভিন্ন সংস্থা।
আবু তালেবের বিরুদ্ধে ওঠা এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমলে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা ও মামলা দায়েরের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বক্তব্য মিলেনি অভিযুক্তের, ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রধান প্রকৌশলীর
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তালেবের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানান, “অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্নীতিকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।















