
রাজস্ব কাস্টম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদায়কারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম হাউস। জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি হওয়া বিপুল পরিমাণ পণ্যের শুল্ক ও কর আদায়ের দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে দীর্ঘদিন ধরেই এই কাস্টম হাউসকে ঘিরে ঘুষ ঘুষ বাণিজ্য, দালালচক্র, অনিয়ম প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ বিভিন্ন আলোচিত হয়ে আসছে। ও মহলে আ.
এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি আলোচনায় উঠে এসেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা এস কে মঈনুল ইসলামের নাম। বিভিন্ন অনিয়ম, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি একটি ভিডিওতে দেওয়া তার মন্তব্য নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
করাই লাগে। বাহিরে আসেন, চা-নাস্তার টাকা দেয়।”
সংশি-ষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কাস্টমসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে যে অনিয়মের অভিযোগ উচ্চারিত হয়ে আসছে, তার মধ্যে রয়েছে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য কম দেখানো,
প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ধারণ করা একটি ভিডিওতে মঈনুল ইসলামকে এক পর্যায়ে বলতে শোনা যায়, “ভাই, আমরা তো একটু হলেও চোর, একটু ১৯-২০ তো
উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যকে নিম্ন করহারভুক্ত হিসেবে শ্রেণিকরণ, যথাযথ শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াই পণ্য খালাস, জরিমানা কমিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে সুবিধা প্রদান এবং নির্দিষ্ট সিএন্ডএফ এজেন্টদের বিশেষ সুযোগ করে দেওয়া। এসব অভিযোগে রাজস্ব কর্মকর্তা এস কে মঈনুল ইসলামের নামও উঠে এসেছে বলে সংশি-ষ্টরা দাবি করেন।
অনুসন্ধানে ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, সিএন্ডএফ সংশি-ষ্ট ব্যক্তি এবং কাস্টমস-সংশি-ষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা হয়। তাদের ভাষ্য, কিছু অসাধু কর্মকর্তা, দালাল ও সুবিধাভোগী চক্রের সমন্বয়ে এমন একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে নিয়মিতভাবে আর্থিক
সুবিধা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম দেখানোর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ সৃষ্টি ।
করা হয়। আবার উচ্চ শুল্কের আওতাভুক্ত পণ্যকে কম শুল্কের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে কিছু আমদানিকারককে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। এতে একদিকে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়, অন্যদিকে সুবিধাভোগীরা আর্থিকভাবে লাভবান হন।
এছাড়া যথাযথ শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াই চালান খালাস, দ্রুত ফাইল নিষ্পত্তি, জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা এড়িয়ে যাওয়ার বিনিময়ে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে বলে সংশি-ষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন:
চলতি বছরের জানুয়ারিতে খুলনার অভয়নগর উপজেলার আমতলা খেয়াঘাটে একটি ব্যক্তিগত বিলাশবহুল গাড়ি নদীতে ডুবে যাওয়ার ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় আসেন এস কে মঈনুল ইসলাম। স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, চট্টগ্রাম থেকে নিজ এলাকায় যাওয়ার পথে তার ব্যবহৃত প্রাইভেটকার নৌকায় ওঠানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভৈরব নদীতে পড়ে যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় গাড়িটি উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর গাড়ির ভেতরে থাকা মূল্যবান সামগ্রী ও স্বর্ণালংকার নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। যদিও এ বিষয়ে মঈনুল ইসলাম দাবি করেন, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধারের খবর অতিরঞ্জিত এবং প্রকৃত তথ্য নয়।
তার ভাষ্য, “গাড়ি ডুবে যাওয়ার ঘটনা সত্য। তবে ২০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধারের যে তথ্য প্রচার হয়েছে, তা সঠিক নয়। খুব অল্প পরিমাণ স্বর্ণালংকার ছিল।”
তবে ঘটনার পর থেকেই তার দৃশ্যমান সম্পদ, জীবনযাপন এবং সম্পদের উৎস নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠতে থাকে। সংশি-ষ্টদের মতে, এসব প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর খুঁজতে হলে প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সম্পদের উৎস যাচাই করা প্রয়োজন। সাংবাদিককে ‘চা-নাস্তার টাকা’ দেওয়ার প্রস্তাব:
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য যাচাইয়ের অংশ হিসেবে এক পর্যায়ে মঈনুল ইসলামের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই সাক্ষাতে তিনি প্রতিবেদককে ‘চা-নাস্তার টাকা’ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। একই আলোচনায় তিনি নিজের কর্মকাণ্ডও সম্পর্কে বিতর্কিত মন্ত ব্যও করেন, যার ভিডিও ধারণ করা হয়।
সংশি-ষ্টদের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্বশীল পদে থেকে এ ধরনের মন্তব্য করলে তা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিশেষ করে রাজস্ব প্রশাসনের মতো সংবেদনশীল খাতে কমব্রত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাগত সততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংশি-ষ্ট মহলের দাবি, উত্থাপিত অভিযোগ, বিতর্কিত বক্তব্য এবং সম্পদের উৎস নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে প্রয়োজন নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরা হলে একদিকে যেমন বিভ্রান্তি দূর হবে, অন্যদিকে প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।
প্রশাসন সংশি-ষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দেশের রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত যেকোনো অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগ অসত্য হলে তা স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরাও জরুরি।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে ঘিরে দালালচক্র, অসাধু কর্মকর্তা, সিএন্ডএফ সিন্ডিকেট, প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠী এবং রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের নেপথ্য অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।















