ঘুষকান্ডে আলোচিত কাস্টমসের এআরও মেহেদী হাসান বহাল তবিয়তে!

ঘুষকান্ডে আলোচিত তথা প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া;বর্তমানে কমলাপুর কাস্টমস হাউজের(আইসিডি) ফরেইন পোস্টে কর্মরত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা(এআরও) মেহেদী হাসান ওরফে ” ফিফটি পার্সেন্ট মেহেদি” এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

প্রসঙ্গত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা(এআরও) মেহেদী হাসান গ্রাহকদের সাথে ফিফটি:ফিফটি সমঝোতা করতেন। ভ্যাটদাতাদের প্রদেয় ভ্যাট ঘুষের বিনিময়ে অর্ধেক করে দিতেন। এজন্যে তিনি সংশ্লিষ্ট মহলে ” ফিফটি পার্সেন্ট মেহেদি” বলে আখ্যা পেয়েছেন।

৪ জুন আত্মস্বীকৃত ঘুষখোর কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অথচ সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা(এআরও) মেহেদী’র ঘুষ গ্রহনের ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা গ্রহন না করায় সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

কমলাপুর আইসিডি কাস্টমস হাউজে বদলি হবার পরও তার স্বভাবে কোন পরিবর্তন হয়নি। যথা পূর্বং তথা পরং। সুযোগ পেলেই করেন গ্রাহক হয়রানি। আদায় করেন ঘুষ। আইসিডি কাস্টমস হাউজের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানাগেছে, মেহেদি হাসান ফরেইন পোস্টে নানাভাবে গ্রাহকদের হয়রানি করছেন। ঘুষ দিতে রাজি না হলে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি প্রবাসিদের পাঠানো পণ্য সামগ্রি গায়েবের সাথেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানাগেছে। মেহেদি হাসান বাই-রোটেশন ডিউটিতে মাসে কয়েকদিন এয়ারপোর্টে ডিউটি করেন। এই সুবাদে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রের সাথে তার যোগাযোগ তৈরি হয়েছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানাগেছে।

কমলাপুর কাস্টমস হাউজের (আইসিডি) ফরেইন পোস্টে কর্মরত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা(এআরও) মেহেদী হাসান ঘুস বাণিজ্য,ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনে(দুদক) দায়েরকৃত এক অভিযোগ সূত্রে জানাগেছে।

১০/৯/২০২৫ তারিখে দুদকে দায়েরকৃত অভিযোগে বলা হয়েছে, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা(এআরও) মেহেদী হাসান বর্তমানে মোংলা কাস্টমস হাউসে কর্মরত আছেন। এর পূর্বে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে কর্মরত ছিলেন। তার পূর্বে গাজীপুর ভ্যাট ডিভিশন ও গুলশান ভ্যাট ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন। তিনি যখন যেখানে কর্মরত ছিলেন সেখানেই ভ্যাট দাতা ও শুল্ককরদাতাদের সাথে পারস্পরিক যোগসাজসে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানেও একই ধরনের অপকর্মে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

সম্প্রতি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা(এআরও) মেহেদী হাসানের ঘুস গ্রহনের একটি ভিডিও ”এনবিআর নিউজ এন্ড ভিউজ” নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে আপলোড হয় এবং নেটিজেনরা তা ভাইরাল করে। যদিও কয়েক দিনের মধ্যেই ফেসবুক গ্রুপে আপলোডকৃত ভিডিওটি ডিলিট করে দেয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে,মেহেদী হাসানের ঘুস গ্রহনের ভিডিওটি তার ঘুস বাণিজ্যের একটি নমুনা মাত্র। তিনি যখনগাজীপুর ভ্যাট ডিভিশন ও গুলশান ভ্যাট ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন;তখন তার রেঞ্জে সবচেয়ে কম ভ্যাট আদায় হতো। কারন ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগসাজস করে কম ভ্যাট ধার্য করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে নিজে অর্থ হাতিয়ে নিতেন। একই ঘুস বাণিজ্য করেছেন চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে। মোংলা কাস্টমস হাউসেও একই কাজ করছেন।

২০১৮ সালে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা(এআরও) পদে যোগদানের পর মেহেদী হাসানকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মাত্র সাত বছরের চাকরি জীবনে এখন অন্তত: ১০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক। খুলনা শহরে সম্প্রতি ১ কোটি টাকা দিয়ে জমি কিনেছেন। সাতক্ষীরা গ্রামের বাড়িতে নির্মান করেছেন বাংলো। করেছেন স্থাবর-অস্থাবর অনেক সম্পদ। একটি প্রাইভেট কার ক্রয় করেছেন। রয়েছে ব্যাংকে এফডিআর। যার তার জ্ঞাত আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মেহেদী হাসান ও তার পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয় পত্রের বিপরীতে সম্পদের অনুসন্ধান করলে অভিযোগের প্রমান পাওয়া যাবে বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া, মেহেদী হাসান ছাত্রজীবনে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। চাকরিতে যোগদানও করেছেন ”আওয়ামী ম্যান” পরিচয়ে। চাকরিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহন করেছেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত ডোনেশন দিতেন। এমনকি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে তিনি সরাসরি অংশগ্রহন করেছেন এবং অর্থ যোগান দিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের ঘুস বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ,জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ ও অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করার জন্যে দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড(এনবিআর) এর প্রতি আহবান জানানো হয়েছে ।

অভিযোগের বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা(এআরও) মেহেদী হাসানের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন,”ঘুস গ্রহনের যে ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে;তা কয়েক বছর আগের গাজীপুর ভ্যাট ডিভিশনে কর্মরত থাকা কালে ধারণকৃত। আমার তৎকালিন গাজীপুর ভ্যাট ডিভিশনের সহকর্মী একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা এই ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করেছে। সে আমার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছে;না দেয়ার কারণে প্রতিহিংসাবশত ভিডিও আপলোড করেছে। তার ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির কল রেকর্ডসহ অন্যান্য প্রমাণ আমার কাছে আছে”। জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ ও আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দেয়নি। বরং প্রতিবেদকের মোবাইল নাম্বার ব্লক করে দিয়েছেন।