রাজধানীতে ৬-৭ নভেম্বর দুই দিনব্যাপী আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা

পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী শস্য ও কৃষিপণ্যের সঙ্গে নগরবাসীর পরিচয় ঘটাতে রাজধানীতে শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী ‘৫ম আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা-২০২৬’। আগামী ৬ ও ৭ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুর-১৩তে অবস্থিত পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে এ মেলা হবে।

উন্নয়ন সংগঠন নাগরিক উদ্যোগ ও আদিবাসী সুহৃদদের যৌথ আয়োজনে বসছে এবারের মেলার পঞ্চম আসর।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে রেলী চাকমা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মেলার স্টল বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বেশ ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

পার্বত্য অঞ্চলের পাশাপাশি সমতলের মান্দি, মণিপুরি, সাঁওতাল ও রাখাইন জনগোষ্ঠীর অনেক উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে স্টল বুকিং দিয়েছেন। বরাদ্দ করা স্টলগুলোর মধ্যে আদিবাসী নারী উদ্যোক্তাদের প্রাধান্য রয়েছে।
মেলায় দর্শনার্থীদের জন্য থাকছে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী রন্ধনপ্রণালিতে তৈরি নানা ধরনের খাবার। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে তেল ও মশলার ব্যবহার ছাড়াই তৈরি বিভিন্ন জনপ্রিয় পদ।

পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী বাঁশের কোঁড়ল বা ব্যাম্বু শুট, কলাপাতায় রান্না করা বিভিন্ন ধরনের হেবাঙ, জুমের শাকসবজি এবং পার্বত্য অঞ্চলের জনপ্রিয় খাবার পাজনের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পাবেন দর্শনার্থীরা।
সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাবারের বৈচিত্র্যও মেলায় বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে। মণিপুরি, গারো ও রাখাইন উদ্যোক্তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের পসরা সাজিয়ে বসবেন। রাখাইন উদ্যোক্তারা কালো ও সাদা বিনি চাল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পিঠা নিয়ে হাজির হবেন। পাশাপাশি থাকবে নানা ধরনের মুন্ডি, যা ইতোমধ্যে বাঙালি ভোজনরসিকদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

মেলার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে থাকছে বিভিন্ন ধরনের টাটকা ফল দিয়ে তৈরি ঝাল খাবার, যা ‘লাকসো’ নামে পরিচিত। মণিপুরি খাবারের মধ্যে পাওয়া যাবে ডাল দিয়ে তৈরি বিশেষ পদ ‘উতি’ এবং বিনি চাল ও দুধ দিয়ে তৈরি ক্ষীরজাতীয় খাবার ‘সাঙ্গোম’। এছাড়া বিভিন্ন জাতের বিনি চাল ও পাহাড়ি মধুও পাওয়া যাবে মেলায়।

খাবারের পাশাপাশি মেলায় থাকবে বৈচিত্র্যময় কৃষিপণ্যের সমাহার। জুমচাষে উৎপাদিত বিষমুক্ত শাকসবজি, পাহাড়ি কলা, মধুপুরের আনারস, পেঁপেসহ বিভিন্ন ধরনের ফলমূল, শুঁটকি এবং নানা জাতের কৃষিপণ্য নিয়ে অংশ নেবেন উদ্যোক্তারা। দর্শনার্থীদের জন্য কাপ্তাই হ্রদের মাছ কেনার সুযোগও থাকবে।

মেলার উদ্দেশ্য নিয়ে নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন জানান, শহুরে জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আদিবাসীদের সমৃদ্ধ জুমচাষ, বৈচিত্র্যময় শস্য ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিচয় ঘটাতেই এ আয়োজন। একইসঙ্গে আদিবাসী উদ্যোক্তারা যেন তাদের উৎপাদিত পণ্য আরও বেশি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করাও মেলার অন্যতম লক্ষ্য।

তার ভাষ্য, টানা পাঁচ বছর ধরে এ মেলার আয়োজন করা হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে রাজধানীবাসীর কাছে এটি বেশ সমাদৃত হয়েছে।

অন্যতম আয়োজক মেইনথিন প্রমীলা বলেন, বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস। এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে বাঙালি জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানোর লক্ষ্যেই আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলার আয়োজন। পাশাপাশি আদিবাসীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত বিষমুক্ত কৃষিপণ্য সম্পর্কে নগরবাসীকে আরও বেশি পরিচিত করানোও এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

মেলায় খাবার ও কৃষিপণ্যের পাশাপাশি প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে মনোজ্ঞ আদিবাসী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে সংগীত পরিবেশন করবেন বাংলাদেশ আইডলখ্যাত মং, পাহাড়ের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী বর্ষা চাকমা, বুলু তঞ্চঙ্গ্যা এবং গারো জনগোষ্ঠীর উদীয়মান সংগীতশিল্পী মার্কুস চিসিম। এছাড়া পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশনা উপভোগ করতে পারবেন দর্শনার্থীরা।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় দুই দিনের এ আয়োজনে রাজধানীবাসীর ব্যাপক সমাগম ঘটবে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ৬ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ১০টায় মেলার উদ্বোধন করবেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান।

মেলায় যেতে মেট্রোরেলের মিরপুর-১০ স্টেশন থেকে রিকশায় প্রায় পাঁচ মিনিট সময় লাগবে। মেলার স্থান পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কমপ্লেক্সের পাশেই রয়েছে স্কলাস্টিকা ও এসওএস শিশু পল্লী। এর বিপরীত পাশে অবস্থিত বিআরটিএ কার্যালয়।

খাবারের স্বাদ, কৃষির বৈচিত্র্য আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনে পঞ্চমবারের মতো আয়োজিত এ মেলা শুধু কেনাবেচার আয়োজন নয়, বরং পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, জীবনধারা ও খাদ্যসংস্কৃতিকে নগরবাসীর সামনে তুলে ধরার একটি মিলনমেলায় পরিণত হবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।