সাত্তার গ্রুপের কাগুজে প্রতিষ্ঠানে অগ্রণী-রূপালী ব্যাংকের ঋণ, খেলাপি হাজার কোটি টাকা

সাত্তার গ্রুপের কাছে অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ৫৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ জমে আছে। অভিযোগ রয়েছে, কাগুজে প্রতিষ্ঠান ও আত্মীয়স্বজনের নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে গ্রুপটি। এসব ঋণ আদায়ে হিমশিম খাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক দু’টি। ঋণ আদায়ে অগ্রণী ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে ১০টি মামলা করেছে।

রূপালী ব্যাংকও ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে। কিন্তু এতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুর শহরের কলেজ রোডে লোকমান মোল্লা পরিচিত একজন সফল ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হিসেবে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল, কমিউনিটি সেন্টার, পাটের গুদাম এবং দান-অনুদানের কারণে অনেকের কাছে তিনি একজন দানবীর হিসেবেও পরিচিত।

তবে এই পরিচয়ের আড়ালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকার ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাঁর ও তাঁর নিয়ন্ত্রিত সাত্তার গ্রুপের বিরুদ্ধে।

কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ
অভিযোগ রয়েছে, লোকমান মোল্লা একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সেগুলোর নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছেন। ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সাত্তার জুট অ্যান্ড ফাইবারস, সাত্তার ট্রেডিং কোম্পানি, সেভেন হেভেন, স্টেয়ার ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল, এসএলজি বেস্ট, এসএলজি ইউনিক ও স্প্যানিস্টার লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর বাস্তব কার্যক্রম, সম্পদ ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কাগজে-কলমে বড় প্রতিষ্ঠানের চিত্র দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মতিঝিল তাদের ব্যাংকে দেওয়া ঠিকানায়ও গিয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি অফিসের অস্তিত্ব।

আত্মীয়দের নামে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব
ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজনদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও পরিচালক হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে। প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাই বাচ্চু হাওলাদারকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান করা হলেও তাঁর পরিবারের দাবি, বাস্তবে তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাঁর স্ত্রী বলেন, কাগজে চেয়ারম্যান হলেও বাস্তবে তাঁর কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ নেই। এছাড়া লোকমান মোল্লার স্ত্রী, শ্বশুর এবং ভাতিজা নূরে আলম রানার নামেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও পরিচালকের দায়িত্ব দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ অন্যত্র রেখে ঋণের দায় আত্মীয়দের ওপর চাপানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকের পাওনা হাজার কোটি টাকা

অগ্রণী ব্যাংকের করা মামলাগুলোতে প্রায় ৬শ’ ৬৫ কোটি টাকা পাওনা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে রূপালী ব্যাংকের কাছেও সাত্তার গ্রুপের কয়েকশ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি রয়েছে। দুই ব্যাংক মিলিয়ে পাওনার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। ব্যাংক সূত্র বলছে, ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হলেও সাত্তার গ্রুপ সাড়া দেয়নি। ফলে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে জামানত বিক্রি করে অর্থ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে প্রভাব ধরে রেখেছেন লোকমান মোল্লা। একসময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে তা ব্যবহার করে পোস্টার-ব্যানার প্রকাশ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে ব্যাংকঋণ গ্রহণ এবং প্রশাসনিক প্রভাব বজায় রাখছেন তিনি।

ব্যাংকের দায়ও প্রশ্নের মুখে

অগ্রণী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, লোকমান মোল্লার কাগুজে প্রতিষ্ঠানগুলোর গুদামে সংরক্ষিত পণ্য পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়ার পর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া এত বড় অঙ্কের ঋণ কীভাবে অনুমোদন পেল? সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। জামানতের মূল্যায়ন, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবসার বাস্তবতা কতটা যাচাই করা হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, “সাত্তার গ্রুপের ঋণ আদায়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। ফলে পাওনা অর্থ আদায়ে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী জামানত বাজেয়াপ্ত ও সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে ঋণ সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ”

এসব বিষয়ে জানতে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

ব্যাংকারদের মতে, যথাযথ যাচাই ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি। রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল নজরদারির সুযোগে যদি খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তবে এর দায় শুধু ঋণগ্রহীতার নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থারও। লোকমান মোল্লাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন অর্থঋণ আদালত ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার বিবেচনায় রয়েছে। তাঁর সম্পদের উৎস, আত্মীয়দের নামে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত মালিকানা, ঋণের অর্থের ব্যবহার এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভূমিকা সবকিছুর নিরপেক্ষ তদন্তই জরুরি।

এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য লোকমান মোল্লার সঙ্গে কথা বলতে তার মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।