দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে এসব কার্ডের মাধ্যমে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। একই সময়ে দেশে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৭ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ হয়েছে প্রিপেইড কার্ডের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্টে দেশে মোট কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯টি। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৭টিতে। একই সময়ে কার্ডের মাধ্যমে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ ২২ হাজার ৭৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৪৭ হাজার ৪৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
কার্ডের ধরনভেদে দেখা যায়, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। একই সময়ে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ২৮ শতাংশ। তবে প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১৬৮ শতাংশ।
চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশি কার্ডধারীরা বিদেশে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে মোট ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন। এ সময়ে মোট লেনদেন হয়েছে ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ৩০টি।
এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫২৫ কোটি ৯০ লাখ, ডেবিট কার্ডে ৪০১ কোটি ১০ লাখ এবং প্রিপেইড কার্ডে ৫৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। জুনে বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। ফলে এক মাসে লেনদেন কমেছে ৫ দশমিক ০৫ শতাংশ।
বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। জুলাইয়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এরপর খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র, পরিবহন, ওষুধ ও ফার্মেসি এবং পোশাকের দোকানে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জুলাইয়ে দেশটিতে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ডে ৯৩ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এরপর থাইল্যান্ডে ৬১ কোটি ৪০ লাখ, যুক্তরাজ্যে ৫৪ কোটি ৪০ লাখ এবং সিঙ্গাপুরে ৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
ডেবিট কার্ডেও বিদেশে বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। জুলাইয়ে দেশটিতে এ কার্ডে ৫৩ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
জুলাইয়ে বিদেশে ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকেরা ২৩৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন। এ সময়ে মোট লেনদেন হয়েছে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৪টি। জুনে এ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
বিদেশিদের কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে-৮২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। নগদ উত্তোলনে ৫৬ কোটি ৩০ লাখ, পরিবহনে ৩২ কোটি ৩০ লাখ এবং পোশাকের দোকানে ২০ কোটি ৯০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড ব্যবহারে এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইস্যু করা কার্ডে ৫১ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এরপর ভারত, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সিঙ্গাপুরে ইস্যু করা কার্ডে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ। একই সময়ে বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড লেনদেন বেড়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড ব্যবহার বেড়েছে ২৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
জুলাইয়ে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আগের মাসে এ পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা।
দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। জুলাইয়ে এ খাতে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা, যা মোট লেনদেনের ৫০ দশমিক ৩১ শতাংশ। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ৪৮৭ কোটি ৯০ লাখ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ৩৭৭ কোটি ১০ লাখ এবং নগদ উত্তোলনে ৩৩৪ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে ভিসার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। জুলাইয়ে ভিসা কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ২৯৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা মোটের ৭৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। মাস্টারকার্ডে ৬৬৫ কোটি ৯০ লাখ এবং অ্যামেক্সে ৩৪৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই পর্যন্ত ৪৮টি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডে অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বকেয়া ঋণের স্থিতি রয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কার্ডের ব্যবহার বাড়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, পরিবহন, সরকারি সেবা ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে।
তবে গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আর্থিক জ্ঞানের ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা, প্রতারণা এবং লেনদেন ব্যয় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা জোরদার ও গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানো গেলে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বিস্তার আরও বাড়বে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।














