
সরকারি চাকরিতে ঢুকলে নাকি দেশের সীমানা পেরোতেও অনুমতি লাগে—এই সাধারণ জ্ঞানটুকু বোধহয় ভুলেই গিয়েছিলেন ঢাকা কাস্টম হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা জনাব শারমিন হেলাল। জিও বা এনওসি নামক দুটি “সামান্য” কাগজের ধার না ধেরে তিনি নাকি রীতিমতো নিয়মিত অতিথির মতো পাড়ি জমিয়েছেন থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায়, তাও আবার একটি নয়, দুটি পাসপোর্টের কল্যাণে! বিধিবিধান যখন কাগজে-কলমে ঘুমিয়ে থাকে, তখন কর্মকর্তার পাসপোর্ট জেগে ওঠে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে—এমনই এক চিত্র ফুটে উঠেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া একটি অভিযোগে। শুধু ভ্রমণ-বিলাসই নয়, তার ও তার স্বামী মোঃ মাহমুদুল ওয়াহিদের বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলা এবং সেই অর্থ বিদেশে পাচারের গুরুতর অভিযোগও।
অভিযোগের বিবরণ
গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে দুদক কার্যালয়ে দাখিলকৃত একটি অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, শারমিন হেলাল চাকরিরত অবস্থায় একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে গত কয়েক বছরে অন্তত চারবার থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া ভ্রমণ করেছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের বিদেশ যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সরকারি আদেশ (জিও) বা অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়া বাধ্যতামূলক। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তিনি এসব ভ্রমণ সম্পন্ন করেছেন।
দুই পাসপোর্টে চারবার ভ্রমণ
দুদকে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, তিনি দুটি পৃথক পাসপোর্ট (নম্বর BP0–70 ও B00–21) ব্যবহার করে এসব ভ্রমণ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগপত্রে উল্লিখিত ভ্রমণের বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে থাইল্যান্ড, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়া, এবং ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পুনরায় থাইল্যান্ড ভ্রমণের তথ্য রয়েছে, যেখানে প্রথম দুটি ভ্রমণে একটি পাসপোর্ট এবং পরের দুটিতে ভিন্ন একটি পাসপোর্ট ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এই দম্পতি দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন এবং দেশে-বিদেশে নিজেদের নামে ও বেনামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তবে এই অভিযোগগুলো এখনো দুদকের প্রাথমিক পর্যায়ে তদন্তাধীন রয়েছে এবং কোনোটিই এখনো প্রমাণিত হয়নি।
সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা অনুযায়ী, যথাযথ অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ বা বিদেশ গমনকে গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এমন অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, সাময়িক বরখাস্ত এমনকি স্থায়ী চাকরিচ্যুতিরও বিধান রয়েছে।
এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে শারমিন হেলালের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে (017110—-29) একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তীতে অভিযোগের বিষয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এছাড়া ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কাছ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য মেলেনি।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।















