
একই পরিবারের চার সদস্য যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খাত কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগে চাকরি করেন, তখন তাদের সততা নিয়ে গর্ব করার কথা। কিন্তু এই পরিবারটির ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক উল্টো। ৩ ভাই ও ১ বোন— এই চারজনই কাস্টমসের বিভিন্ন পদে আসীন হয়ে গড়ে তুলেছেন এক অকল্পনীয় সম্পদের পাহাড়। সরকারি বেতন-ভাতার তোয়াক্কা না করে রাজধানী ঢাকা ও গ্রামের বাড়িতে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে এই ‘কাস্টমস পরিবার’-এর বিরুদ্ধে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে এদের বড় ভাই আবুল কালাম আজাদের দুর্নীতি নিয়ে খবর প্রকাশের পর বেরিয়ে এসেছে পুরো পরিবারের থলের বিড়াল।
### বড় ভাই আবুল কালাম আজাদ: মগবাজারেই ৫টি ফ্ল্যাট!
পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য **আবুল কালাম আজাদ** বর্তমানে রাজশাহী ভ্যাটের রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। কাস্টমসের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার মগবাজার বাটার গলিতে অবস্থিত বিলাসবহুল ‘ডমিনো’ (dom ino) অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে তাঁর একারই রয়েছে **৫টি আলিশান ফ্ল্যাট**। সরকারের একজন সাধারণ রাজস্ব কর্মকর্তার বৈধ আয় দিয়ে রাজধানীর বুকে একই বিল্ডিংয়ে পাঁচটি ফ্ল্যাট কেনা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
### ছোট ভাই রাজু: একই বিল্ডিংয়ে আরও ফ্ল্যাট
বড় ভাইয়ের দেখানো পথেই হেঁটেছেন তাঁর ছোট ভাই **রাজু**। তিনি কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট (ঢাকা পশ্চিম)-এর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। বড় ভাই আবুল কালাম আজাদের ক্ষমতার ছায়ায় রাজুও বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। মগবাজারের ঠিক একই ডমিনো বিল্ডিংয়ে রাজুর নামেও **আরও একটি ফ্ল্যাট** রয়েছে। অর্থাৎ, একই ভবনে এই দুই ভাইয়ের কব্জায় রয়েছে মোট ৬টি ফ্ল্যাট!
### বোন তানিয়া সুলতানা: মিরপুরে ফ্ল্যাট ও গাড়ির বহর
পরিবারের একমাত্র বোন **তানিয়া সুলতানা**ও পিছিয়ে নেই এই হরিলুটের দৌড়ে। ঢাকা কাস্টম হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত তানিয়া সুলতানা রাজধানীর অভিজাত এলাকা মিরপুরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁর যাতায়াতের জন্য রয়েছে নিজস্ব দামি প্রাইভেট কার। একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার দৃশ্যমান আয়ের সাথে তাঁর এই বিলাসী জীবনযাপনের কোনো মিল নেই। ঢাকার পাশাপাশি নিজের গ্রামের বাড়িতেও তানিয়া বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পদ নিজের নামে রেজিস্ট্রি করেছেন বলে তথ্য মিলেছে।
### আরেক ভাই সাইফুল: সম্পদের বিশাল আখ্যান
পরিবারের চতুর্থ কর্মকর্তা হলেন **সাইফুল**। তিনিও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কাস্টমসে কর্মরত। সাইফুলের বিরুদ্ধেও নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি চাকুরির আড়ালে সিন্ডিকেট তৈরি করে ব্যবসায়ীদের জিম্মি ও শুল্ক ফাঁকির মাধ্যমে সাইফুল এই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
### বাবার নামে গ্রামে মার্কেট ও কোটি টাকার ভূ-সম্পত্তি
এই কাস্টমস চতুষ্টয় শুধু ঢাকাতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি। নিজেদের অবৈধ কালো টাকা সাদা করতে এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করতে তারা বেছে নিয়েছেন নিজেদের গ্রামকে। গ্রামে তাদের বাবার নামে বিশাল এলাকা জুড়ে একের পর এক সম্পত্তি কেনা হয়েছে। বাবার নাম ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল বাণিজ্যিক মার্কেট, কৃষিজমি ও বিপুল স্থাবর সম্পত্তি। এলাকাবাসীর মতে, রাতারাতি এই পরিবারের আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া দেখে সবাই বিস্মিত, কিন্তু কাস্টমসের ক্ষমতার ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।
### দুদকের নজরদারির দাবি
কাস্টমসের মতো স্পর্শকাতর সেক্টরে একই পরিবারের চারজন কর্মকর্তা মিলে যেভাবে দুর্নীতির জাল বুনেছেন, তাকে ‘পারিবারিক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের রাজস্ব বোর্ডের (NBR) অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে এই চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। একজন রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিনজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার এই বিপুল ও দৃশ্যমান অবৈধ সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখলে থলের বিড়াল পুরোপুরি বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।















