
ড. নাসিমুল গনি। প্রশাসন ক্যাডারের ’৮২ ব্যাচের এই কর্মকর্তা এক সময় স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারের পিএস (একান্ত সচিব) পদে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তাঁর হাত দিয়েই জাতীয় সংসদে কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটে। নাসিমুল গনির সেই দুর্নীতি-অনিয়মের বোঝা এখনও বইতে হচ্ছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়কে। ৫ আগস্ট, ২০২৪-এর পরে ভাগ্য খুলে যায় নাসিমুল গনির। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রথমে সিনিয়র সচিব পদে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে নিয়োগ পান। স্বরাষ্ট্র সচিব পদ শূন্য হওয়ার পর এখানে আসেন। এরপরে এখন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। স্বরাষ্ট্র সচিব পদে থাকাকালে দুদকে একাধিক অভিযোগ আসে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগপত্রে তার নিজের, ছেলে এবং পিএস’র নানা অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, নরসিংদীর সাবেক এসপি, বর্তমানে যিনি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি) পদে আছেন মো. আব্দুল হান্নান, বেপরোয়া ঘুষ লেনদেনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও তাকে অবিশ্বাস্যভাবে ছাড় দিয়েছেন সচিব নাসিমুল গনি।
এসপি আব্দুল হান্নানের ঘুষ লেনদেনের ওই ঘটনাটি ছিল ব্যাপক আলোচিত। আব্দুল হান্নান আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলেকে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন এসপি পদে আকর্ষণীয় পদায়নের জন্য। পরবর্তীতে এই টাকা তুলতে গিয়েও অনেক কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটান তিনি। আব্দুল হান্নানের ফোন রেকর্ডসহ গণমাধ্যমে এ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পুরো পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয় এতে। আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিভাগীয় মামলার তদন্তে ঘুষ লেনদেনসহ সবগুলো ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত দণ্ড প্রদান করা হবে না কেন, এই মর্মে ১০ দিনের সময় দিয়ে নোটিশও ইস্যু করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির স্বাক্ষরেই চাকরিচ্যুতির নোটিশ ইস্যু করা হয়। কিন্তু এরপরেই দৃশ্যপট ক্রমান্বয়ে পাল্টাতে থাকে। তিন মাস পরে চাকরিচ্যুতির গুরুদণ্ডের পরিবর্তে লঘুদণ্ড ‘তিরস্কার’ করা হয় তাকে। একে বিচারের নামে ‘প্রহসন’ এবং ‘কৌতুক’ বলেই আখ্যায়িত করছেন সংশ্লিষ্টরা। কথা উঠেছে, এসপি (বর্তমানে বরিশাল পুলিশের ডিসি) আব্দুল হান্নানের কাছ থেকে কত টাকা নিয়ে সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি তাকে এত বড় ‘ছাড়’ দিয়েছেন?
আব্দুল হান্নানের শুধু ঘুষ প্রদান বা এ সংক্রান্ত অনিয়মই নয়, নরসিংদীর এসপি পদে থাকাকালে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে তাদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ আদায়ের প্রমাণসহ তথ্যও প্রকাশ হয়েছে একই সময়ে। যদিও এ বিষয়ে তদন্ত হয়নি অথবা তদন্ত কমিটি এড়িয়ে গেছে। নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, তদন্ত করলে এসব ঘটনাও হাতেনাতে প্রমাণিত হতো। অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এতগুলো গুরুতর অপরাধের পরও অপরাধী মো. আব্দুল হান্নানের কিছুই হয়নি। চাকরিচ্যুতি বা কারাগারে যাওয়া তো নয়ই- সাসপেন্ড, ওএসডি বা সংযুক্তিতে থাকতে হয়নি এক দিনের জন্যও। অপরাধ প্রকাশ হওয়ার পর বরং তাকে নরসিংদী গোয়েন্দা পুলিশের এসপি থেকে সরাসরি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। যদিও এটি একেবারেই অবিশ্বাস্য, কিন্তু এই অবিশ্বাস্য কাজগুলো সবই হয়েছে তখনকার স্বরাষ্ট্র সচিব, বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির হাত দিয়েই।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এ ধরনের গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতি থেকে ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং নজিরও নেই। শুধু চাকরিচ্যুতিই নয়, দেশের প্রচলতি আইনে তার বিরুদ্ধে একাধিক ঘটনার দুর্নীতির মামলা এবং তাতে সাজা হওয়াটা নিশ্চিত ছিল। তাতে আব্দুল হান্নানকে এখন কারাগারেই থাকতে হতো। কিন্তু, এ সবকিছু থেকে আব্দুল হান্নানকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন নাসিমুল গনি। এক্ষেত্রে ‘ডিল’টা আকারে কত ছিল, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ, পুলিশের নৈতিক অধঃপতন এবং সারাদেশে আইন-শঙ্খলার অবনতির পেছনে নাসিমুল গনিদের এসব অপকর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন, অপরাধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।
ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে পুলিশ বিভাগের ডিআইজি মিজানুর রহমান ওরফে মিজানের ইস্যুটা কারো অজানা নয়। আওয়ামী লীগ আমলের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের তদন্ত চলাকালে ডিআইজি মিজান দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে দুই দফায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেন। ডিআইজি মিজান নিজেই গণমাধ্যমের সামনে এই ঘুষ প্রদানের বিষয়টি ফাঁস করেন। ঘুষ লেনদেনের অডিও রেকর্ডও ডিআইজি মিজান স্বেচ্ছায় সরবরাহ করেন। এবং তিনি ওই ঘুষ প্রদানে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করেন। দুদক পরিচালক এনামুল বাছির ব্ল্যাকমেইলিং করে বার বার তাঁর কাছ থেকে টাকা আদায় করছিলেন। অবশেষে মিজান অন্য কোনো উপায় না পেয়ে ঘুষের কথা ফাঁস করেন বলে জানান।
তবে ‘বাধ্য হয়ে’ ঘুষ প্রদান এবং নিজে এরজন্য ‘দায়ী নন’ দাবি করলেও ঘুষের দায় থেকে ডিআইজি মিজানুর রহমান মোটেই ছাড় পাননি। ঘুষ প্রদানের দায়ে তাকে সঙ্গে সঙ্গেই সাময়িক বরখাস্ত এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপরে গ্রেফতার এবং দুদকের মামলায় তাঁর তিন বছরের কারাদণ্ডও হয়। অথচ, মো. আব্দুল হান্নানের অপরাধ একটি নয়- আকর্ষণীয় পদায়নের জন্য ঘুষ প্রদান, ঘুষের টাকা তুলতে গিয়ে অধঃস্তন কর্মকর্তার ওপর অন্যায়ভাব চাপ সৃষ্টি, অধঃস্তন কর্মকর্তাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়ে তাদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ আদায় প্রভৃতি অনেকগুলো গুরুতর বিষয় থাকা সত্ত্বেও তাকে সব অপরাধ থেকে অবৈধভাবে বাঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাকে ‘রহস্যজনক’ এবং ‘নজিরবিহীন’ বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসপি পদে পদায়নের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলেকে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ
আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৩ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে সাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতিকে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দেন মো. আব্দুল হান্নান। এসপি পদে পদায়নের জন্য এই ঘুষ দেওয়া হয়। তবে জ্যোতিকে সরাসরি নয়, জনৈক রবিউল মুন্সীর মাধ্যমে এই টাকা ঘুষ দিয়েছেন তিনি। এই টাকা রবিউল মুন্সীর কাছ থেকে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান হয়ে জ্যোতির কাছে গেছে। পেশায় রবিউল মুন্সী একজন প্রকাশনা ব্যবসায়ী হলেও আদতে তিনি পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানের টাকা কালেকশনের দালালদের একজন ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের কারণে পদায়নটি আর হয়নি। তবে আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত দাবি করে আব্দুল হান্নান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নরসিংদীর এসপি পদে পদায়ন বাগিয়ে নেন। আর এখানে বসেই শুরু করেন ব্যাপকহারে দুর্নীতি-অপকর্ম, চাঁদাবাজি, এমনকি মাদক ব্যবসায়েও জড়িত হওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ আমলে এসপি পদে পদায়নের জন্য দালাল রবিউল মুন্সীর মাধ্যমে যে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন তা তোলার দায়িত্ব দেন অধীনস্ত নরসিংদীর ডিবি ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক এস এম কামরুজ্জামানকে। বস-এর নির্দেশে কামরুজ্জামান বাধ্য হন ঘুষের টাকা তোলার কাজে লেগে যেতে। ৫ লাখ টাকা তিনি রবিউল মুন্সীর কাছ থেকে আদায় করে দেনও। বাকি ৪৫ লাখ টাকার জন্য এস এম কামরুজ্জামানের ওপর চাপ দিতে থাকেন এসপি আব্দুল হান্নান। এরই ধারাবাহিকতায় ৯ নভেম্বর, ২০২৪ অধীনস্ত কামরুজ্জামানকে নিয়ে ঢাকায় আসেন এসপি আব্দুল হান্নান। রবিউল মুন্সী মনিপুরী পাড়ায় ১৪৭/১ পুরাতন বিমানবন্দর সড়কে গোল্ডেন টাচ পাবলিকেশন্সের মালিক। অবশিষ্ট ৪৫ লাখ টাকা উদ্ধারের জন্য এখানে আসেন তারা। এসপি আব্দুল হান্নানের উপস্থিতিতেই পুলিশ পরিদর্শক এসএম কামরুজ্জামান স্বহস্তে একটি লিখিত ডকুমেন্ট তৈরি করেন। এরপর ক্ষমতার অপব্যবহার করে জোরপূর্বক রবিউল মুন্সীর স্বাক্ষর নেন। ওই ডকুমেন্টে এসপি আব্দুল হান্নানও গ্রহণকারী হিসাবে স্বাক্ষর দেন। পরবর্তীতে গণমাধ্যমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথোপকথনের সময় আব্দুল হান্নান বদলিসংক্রান্ত বিষয়ে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন এবং টাকা উদ্ধারে অধীনস্ত পুলিশ সদস্যকে ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করেন। যা পরবর্তীতে তদন্তে সাক্ষ্য-প্রমাণে এবং ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়।
অধঃস্তন কর্মকর্তার কাছ থেকে চাপ দিয়ে নিয়মিত ঘুষ গ্রহণ, যা তদন্তই হয়নি
‘ঘুষখেকো’ আব্দুল হান্নানের নানা অপকর্মের অবিশ্বাস্য সব তথ্য সিনেমার কল্পকাহিনিকেও হার মানাবে। অধীনস্থ পুলিশ সদস্য ছাড়াও তিনি মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের অনেক ক্ষমতার অপব্যবহারকারী প্রভাবশালীকে শেল্টার দিয়েছেন নরসিংদীতে থাকাকালে। এ ছাড়া নিয়মিত মোটা অঙ্কের কারবার ঠিকঠাক রাখতে একটি নিজস্ব বলয়ও গড়ে তুলেন। গত বছরের এপ্রিলে এ নিয়ে দৈনিক যুগান্তরসহ জাতীয় গণমাধ্যমসমূহে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অধীনস্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে ঘুষ আদায়ের বেশকিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরা হয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
তাতে দেখা যায়, ১০ মার্চ, ২০২৫ ডিবি ইন্সপেক্টর কামরুজ্জামানের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েছেন এসপি আব্দুল হান্নান। সেখানে সৈয়দুর রহমান নামে জনৈক ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে দুই লাখ টাকা পাঠাতে বলা হয়। ওই ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব (ব্র্যাক ব্যাংক, বরিশাল ব্রাঞ্চ, হিসাব নম্বর ০৫০১১০২৫২৯১৪৮০০১) উল্লেখ করে লেখা হয়, ‘টু লাখ টুমোরো।’ এর আগেও এসপি আব্দুল হান্নান কামরুজ্জামানের মুঠোফোনে দফায় দফায় ব্যাংক হিসাব পাঠিয়ে এভাবে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন।
এর আগে ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ রাত ৯টা ৯ মিনিটে মো. নাহিদুজ্জমান নামে একজনের কাছে টাকা পাঠাতে ডিবি ইন্সপেক্টর কামরুজ্জামানকে ক্ষুদে বার্তা পাঠান। সেখানে ডাচ্-বাংলা এজেন্ট ব্যাংকিং (৭০১৭০১৯৬৬৩৫৩৬) নম্বর উল্লেখ করে টাকা পাঠানোর সাংকেতিক শব্দ ‘টু লাখ টুমোরো’ লেখা হয়। এরপর কামরুজ্জামান এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ওই হিসাবে ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে ২ লাখ টাকা পাঠান। ৫ জানুয়ারি, ২০২৫ মো. শাহজাহান আলীর নাম লিখে ইসলামী ব্যাংক ঝিনাইদহ ব্রাঞ্চের হিসাব নম্বর (২০৫০১৭৫০২০২২৪৯১০০) পাঠান। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়ে ৪২ হাজার টাকা পাঠাতে বলেন এসপি। ৬ জানুয়ারি, ২০২৫ ইসলামী ব্যাংক নরসিংদী শাখা থেকে এসপির পাঠানো ওই হিসাবে ৪২ হাজার টাকা পাঠান ইন্সপেক্টর কামরুজ্জামান। এর আগে ২৬ নভেম্বর, ২০২৪ শেফালি খাতুনের নাম লিখে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, অগ্রণী ব্যাংক শাখায় ৫০ হাজার টাকা পাঠাতে মেসেজ পাঠান। কামরুজ্জামান ২৬ নভেম্বর, ২০২৪ শেফালির অ্যাকাউন্টে (০২০০০০৭৬৪৭৯৬১) ৫০ হাজার টাকা পাঠান। এছাড়া নুরুজ্জামান নামে আরেকজনের ইসলামী ব্যাংকের আরেকটি হিসাবে ২৬ নভেম্বর, ২০২৪ তারিখে ৩০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। এমনকি বিকাশ নম্বরে ১৫ হাজার টাকাও নিয়েছেন এই এসপি। এভাবে টাকা পাঠাতে এসপি তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেছেন।
এ বিষয়ে ইন্সপেক্টর কামরুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, “এসপি স্যার প্রায় সময় আমাকে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে টাকা পাঠাতে বলতেন। দিনের পর দিন হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে এই টাকা পাঠাতে আমাকে বাধ্য করতেন। ব্যক্তিগত নম্বর থেকে (০১৭১৬০৫৫১০০) মেসেজ পাঠিয়ে আবার এসপি বলতেন, ‘আমি একটি এসএমএস করেছি দেখেন, এ নম্বরে দুই লাখ টাকা পাঠান।’ এভাবে অসংখ্যবার টাকা পাঠানোর কারণে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। কয়েকদিন আগে বিরক্ত হয়ে তার টাকা পাঠানোর নির্দেশনার বিষয়ে আমি বলেছি, ‘স্যার এ মুহূর্তে আমার কাছে কোনো টাকা নেই। আর কোনো টাকা পাঠাতে পারব না। এভাবে টর্চার করলে আইজি স্যারকে লিখিত অভিযোগ দিতে বাধ্য হব।’ এ কথা বলার পর তিনি ফোন রেখে দেন এবং আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে যান।”
গাঁজা বিক্রিতে জড়িত থাকার অভিযোগ
নরসিংদীর আদালতের মালখানায় না পাঠিয়ে আটক ৯৬ কেজি গাঁজা বিক্রির ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনা হয়েছিল। ওই ঘটনায় পুলিশের দুই পরিদর্শক এবং এক জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এর পেছনে ছিলেন পুলিশ সুপার আব্দুল হান্নান। কেননা তাকে মাসোহারা দিয়েই মাদক পাচার করেছে চোরাচালানকারীরা। কিন্তু অন্য টিমের হাতে আটকা পড়ে এই চালান।
জানা যায়, ৫ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর শিবপুরের সৃষ্টিগড় থেকে ৬ বস্তা গাঁজা উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। প্রতি বস্তায় ১৬ কেজি করে মোট ৯৬ কেজি গাঁজা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে আনা হয়। সেখান থেকে কাগজে কলমে এসব গাঁজা আদালতে পাঠানো হয়েছে দেখানো হলেও তা মালখানায় নেওয়া হয়নি। দুই দিন পর কাগজে কলমে গত ১১ মার্চ এ মাদকদ্রব্য ধ্বংস করার প্রমাণপত্র তৈরি করা হয়।
কিন্তু এই ঘটনার পর উল্টো এমএম কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। তাকে ডিবি থেকে সরিয়ে ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ঘটনার পরপর কামরুজ্জামান গণমাধ্যমে বলেন, ‘ডিবির ওসিসহ সব ওসি যা কিছু করেন সব এসপির নির্দেশেই করেন।’
তিনজনের টিম করে টাকা কামানো
গত বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এসআই ও এএসআইদের পোস্টিং করিয়ে টাকা নিয়েছেন এসপি আব্দুল হান্নান। পদপ্রত্যাশীদের জোগাড় করেন সদর থানার ওসি মোহাম্মদ এমদাদুল হক। পতিত সরকারের আমলে ডিবিতে কর্মরত এসআই মোস্তাক ও এএসআই হারেছ মিয়াকে সদর থানায় পোস্টিং করে আনা হয়। একই সঙ্গে এসপির এলাকায় বাড়ি পুলিশ সদস্য রবিউলকেও আনা হয় সেখানে। এই তিনজনের সঙ্গে এসপি হান্নানের অত্যন্ত সু-সম্পর্ক। তারাই মূলত জেলা দাপিয়ে বেড়ান। এদের দিয়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করে টাকা কামান এসপি হান্নান। আওয়ামী লীগপন্থি ও বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের তালিকা করে তাদের কাছে পাঠানো হয় ওই তিনজন। এরপর তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের পর তা পৌঁছে দেওয়া হয় এসপি হান্নানের কাছে।
এমনকি এসপি আব্দুল হান্নান প্রায় সময়ই রেঞ্জ ডিআইজি অফিসের কথা বলে বিভিন্ন থানা থেকে দুই লাখ টাকা করে নিয়েছেন। এছাড়া ডিবিতে মাইক্রোবাস রিকুইজিশনের কথা বলে বিল ভাউচার করে প্রতি মাসে দুই থেকে তিন লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন। অথচ ডিবিতে এ প্রক্রিয়ায় কোনো গাড়িই ব্যবহার হয় না।
বিভাগীয় মামলায় ‘গুরুতর’ অপরাধ প্রমাণিত, চাকরিচ্যুতির নোটিশের পর শাস্তি শুধুমাত্র ‘তিস্কার’
জেলায় এসপি হিসাবে পদায়নের জন্য অনৈতিকভাবে ৫০ লাখ টাকা প্রদান ও পরে সেই টাকা আদায়ে ক্ষমতার প্রভাব খাটানোর প্রমাণ পেয়েছে এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি। বিধি অনুযায়ী আব্দুল হান্নানকে শাস্তিযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাকে কেন চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অন্য কোনো দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে না জানতে চেয়ে নোটিশ ইস্যু করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তখনকার সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি। তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
২৫ আগস্ট, ২০২৫ এসপি আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে অভিযোগনামায় স্বাক্ষর করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি। ওইদিনই তাকে নরসিংদী থেকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) হিসাবে বদলি করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গুরুতর এমন অভিযোগ গঠনের পর বরিশালে নতুন পদায়নকে তখন ‘নজিরবিহীন’ উল্লেখ করেন পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তাদের অনেকেই। তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর অধীনে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স বিভাগীয় মামলা করে। মামলা নং-১৭/ ২০২৫।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগনামায় বলা হয়, “আব্দুল হান্নান নরসিংদী জেলায় যোগদানের আগে ২০২৩ সালে পুলিশ সুপার হিসাবে জেলায় পদায়ন পেতে রবিউল মুন্সী নামে একজনকে ৫০ লাখ টাকা দেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে রবিউল মুন্সী এসপি হিসাবে পদায়নের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে আব্দুল হান্নান নরসিংদী জেলায় এসপি হিসাবে যোগদানের পর রবিউল মুন্সীর কাছ থেকে উক্ত টাকা উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৯ নভেম্বর এসপির অধীনস্ত ডিবি ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) এসএম কামরুজ্জামান কর্তৃপক্ষের অনুমতি/ছুটি ছাড়াই ঢাকায় আসেন। তিনি রাজধানীর বিজয় সরণিসংলগ্ন মনিপুরী পাড়ায় রবিউল মুন্সীর অফিসে গিয়ে নগদ ৫ লাখ টাকা আদায় করেন। অবশিষ্ট ৪৫ লাখ টাকা উদ্ধারের জন্য পুলিশ পরিদর্শক এসএম কামরুজ্জামান স্বহস্তে একটি লিখিত ডকুমেন্ট তৈরি করেন। এরপর ক্ষমতার অপব্যবহার করে জোরপূর্বক রবিউল মুন্সীর স্বাক্ষর নেন। ওই ডকুমেন্টে এসপি আব্দুল হান্নানও গ্রহণকারী হিসাবে স্বাক্ষর দেন।”
স্বরাষ্ট্র সচিবের অভিযোগনামায় এ বিষয়ে আরও বলা হয়, “৫ এপ্রিল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সাংবাদিক নেসারুল হক খোকনের সঙ্গে মোবাইলে কথোপকথনের সময় আব্দুল হান্নান বদলিসংক্রান্ত বিষয়ে ৫০ লাখ টাকা লেনদেন এবং টাকা উদ্ধারে অধীনস্ত পুলিশ সদস্যকে ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করেন। যা সাক্ষ্য-প্রমাণে এবং ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়। পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুগান্তরে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় জনসম্মুখে পুলিশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এছাড়া সরকারি বিধিবহির্ভূতভাবে অধস্তন পুলিশ সদস্যকে অবৈধ পন্থায় ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত করেন এসপি। এসব বিষয় অপেশাদার ও অকর্মকর্তাসুলভ কর্মকাণ্ড, কর্তব্য কাজে অবহেলা, বিভাগীয় নিয়মশৃঙ্খলা পরিপন্থি তথা অসদাচরণ এবং দুর্নীতি পরায়ণতার শামিল। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে এসপি আব্দুল হান্নানকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এর ৩(খ) এবং ৩ (ঘ) অনুযায়ী যথাক্রমে অসদাচরণ (মিসকন্ডাক্ট) এবং দুর্নীতি পরায়ণতার (করাপশন) অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। একই বিধিমালার ৪(৩) এর উপ-বিধি(ঘ) অনুসারে কেন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অন্য দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে না তার লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে আব্দুল হান্নানকে। কৈফিয়তনামা পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।”
অভিযোগ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারির পর পুলিশ সুপার আব্দুল হান্নান লিখিত জবাব দাখিল করেন এবং ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন করেন। ১৯ নভেম্বর, ২০২৫ অনুষ্ঠিত শুনানিতে উভয়পক্ষের বক্তব্য, নথিপত্র ও অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। কিন্তু এত গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও আব্দুল হান্নানকে চাকরিচ্যুতির পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘তিরস্কার’ করা হয়। ২৩ নভেম্বর, ২০২৫ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তখনকার সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির স্বাক্ষরে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়। সূত্র: শীর্ষ নিউজ
-বিশেষ প্রতিবেদক















