
প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা আর খামখেয়ালিপনার এক নজিরবিহীন ফাঁদে পড়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) নবসৃষ্ট পদগুলোতে পদোন্নতি ও পোস্টিং পাওয়া শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। পোস্টিং আছে কিন্তু বাস্তবে অফিসের কোনো অস্তিত্ব নেই, নেই কোনো স্টাফ বা পরিদর্শক গাড়ি। এমনকি ১০ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে বেতন-ভাতাও। ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ ($iBAS++$) এবং অফিস কোড অনুমোদন না হওয়ায় কর্মহীন হয়ে দিন কাটাচ্ছেন বিসিএস ক্যাডারের শীর্ষ প্রকৌশলীরা। অন্যদিকে দায়িত্বের এলাকা ভাগ না হওয়ায় রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও সংস্কার কাজও স্থবির হয়ে পড়েছে।
সারাদেশে সরকারি স্থাপনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যমান জনবল দিয়ে কাজ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে গণপূর্তে নতুন সেটআপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। নানা কাটাছেঁড়ার পর গত বছরের ৭ আগস্ট ৩১১টি পদ সৃজনে জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ চূড়ান্ত সম্মতি দেয়। এর মধ্যে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারেরই রয়েছে ১০৭টি পদ। কিন্তু পদ অনুমোদন দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ‘অফিস কোড’ কিংবা বাজেট বরাদ্দের জন্য প্রয়োজনীয় ‘আইবাস কোড’ আজ পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটিই ভেস্তে গেছে।
অফিস নেই, বেতন নেই: প্রকৌশলীদের মানবেতর জীবন
অদ্ভুত এই পোস্টিংয়ের কারণে কর্মকর্তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। যেমন:
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সানাউল্লাহ: ঢাকা ডিভিশন-২ থেকে তাকে গত বছরের আগস্টে শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ বদলি করা হয়। ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি কোনো অফিস বা তার আওতাধীন এলাকা বুঝে পাননি। উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী বা কোনো স্টাফও নেই তার। ১০ মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় তার অধীনস্থ এলাকার সব টেন্ডার ও সংস্কার কাজ শেরেবাংলানগর-১ বিভাগ থেকে করা হচ্ছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন: জাতীয় সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয়ের সময় আলোচনায় আসা এই কর্মকর্তাকে গত মার্চে ইএম ডিভিশন-১২ তে বদলি করা হয়। কিন্তু সেই ডিভিশনের কোনো অস্তিত্বই নেই। মাঝেমধ্যে পূর্ত ভবনের সংস্থাপন বিভাগে হাজিরা দেওয়া ছাড়া তার কোনো কাজ নেই, বন্ধ রয়েছে বেতন ও গাড়ি সুবিধাও।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদ: বিসিএস ১৫ ব্যাচের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নতুন সেটআপে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম) হয়েছেন। কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে আগামী ডিসেম্বরে অবসরে যাবেন তিনি। অথচ গত ৬ মাস ধরে কোনো অফিস ও বেতন-ভাতা না পেয়ে কর্মজীবনের শেষ সময়ে এসে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল: ময়মনসিংহ থেকে নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এ পোস্টিং পেয়ে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। অফিস না থাকায় অগত্যা মহাখালী ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিবুল ইসলামের অফিস ‘দখল’ করে বসছেন তিনি। ফলে নির্বাহী প্রকৌশলী নিজেই এখন নিজের অফিসে উদ্বাস্তুর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মোস্তফা কামালও ৮ মাস ধরে বেতনহীন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভুক্তভোগী এক নির্বাহী প্রকৌশলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—
“এমন পোস্টিং আমাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। অফিস নেই, গাড়ি নেই, কাজ নেই, এমনকি জীবনধারণের জন্য বেতনটাও নেই! পরিবার থেকেও এখন প্রশ্ন উঠছে—আমাদের আদৌ চাকরি আছে কি না? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমাদের কাছে নেই।”
অন্যান্য কর্মকর্তাদের মতে, অধিদপ্তরের উচিত ছিল আগে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অফিস কোড ও কর্মবণ্টন নিশ্চিত করা, লজিস্টিক সাপোর্ট ও চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা করা এবং এরপর পদায়ন করা। তা না করে তড়িঘড়ি পোস্টিং দেওয়ায় এই উদ্ভট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব শেখ নাজমুস সাকিব স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ১৯টি অফিসের আইবাস কোড সৃজনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ মাসেও অর্থ মন্ত্রণালয় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ গণপূর্ত অধিদপ্তর নতুন পদে বদলি ও পদোন্নতি দিতে যতটা উন্মুখ ছিল, নতুন অফিসের সীমানা নির্ধারণ ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে ততটাই অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
এই নজিরবিহীন সংকট ও তদবিরের বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “আমরা অধিদপ্তর থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা ও যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, শিগগিরই অফিস কোড ও আইবাস কোড সৃজন সম্পর্কিত এই জটিল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।”















