১২ বছরের চাকরীতে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা কর্মকর্তা তুহিন

২০১৪ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টম ও ভ্যাট বিভাগে সাধারণ একজন ‘সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা’ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তুহিন। মাত্র এক দশকের ব্যবধানে নন-ক্যাডার এই কর্মকর্তার সম্পদ এখন আকাশচুম্বী। যশোর, ঢাকা বন্ড, সিলেট ও চট্টগ্রাম ঘুরে বর্তমানে রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্বরত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠেছে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘুষ, সিন্ডিকেট পরিচালনা, বন্ড জালিয়াতি, পণ্য আটকে চাঁদাবাজি এবং এমনকি মাদক চোরাচালানের মতো গুরুতর অপরাধের মাধ্যমে এই বিশাল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি।

যেখানেই পদায়ন, সেখানেই দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য
যশোরে দুর্নীতির হাতেখড়ি (২০১৪-২০১৬):

চাক্রিতে যোগদানের পর প্রথম পদায়ন হয় যশোর ভ্যাট কমিশনারেটে। সেখানে থাকাকালীনই স্থানীয় নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মোটা অঙ্কের ‘মাসোয়ারা’ (নিয়মিত ঘুষ) নেওয়া শুরু করেন তুহিন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৬ সালে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে তদবিরের মাধ্যমে অবিভক্ত ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে (বর্তমানে দক্ষিণ বন্ড) বদলি হন তিনি। বন্ডে এসে তিনি চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। দুর্নীতির দায়ে তৎকালীন কমিশনার তাকে ৬ মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করলে, তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কমিশনারকেই দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। বিষয়টি তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান পর্যন্ত গড়ায়। সাসপেন্ড থেকে ফিরে এসে আরও বীরদর্পে দুর্নীতি মেতে ওঠেন এবং এখানেই থাকাকালীন প্রায় ৫০ কোটি টাকার মালিক হন।

বন্ডের পর তার পোস্টিং হয় সিলেটের তামাবিল শুল্ক স্টেশনে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে পণ্যবাহী ট্রাক আটকে প্রতি গাড়ি থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করতেন, যার ফলে দৈনিক আয় দাঁড়াত প্রায় ১০ লাখ টাকা। তামাবিলে থাকাকালীন তিনি মদের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন এবং বিজিবির হাতে বিপুল পরিমাণ মদসহ সশরীরে আটক হন। সে সময় ছবিসহ জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও এনবিআরের শীর্ষ মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে পার পেয়ে যান। এছাড়া সিলেটে উপার্জিত ঘুষের ৪০ লাখ টাকা গোপন করতে গ্রামের এক মুদি দোকানদারের ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। পরে জানাজানি হলে ওই দোকানদারকেও বিপুল অঙ্কের ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ করেন।

তামাবিল থেকে বদলি হয়ে আসেন চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সেখানে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। পোর্টে কার পণ্য কখন খালাস হবে তা নিয়ন্ত্রণ করত এই সিন্ডিকেট। কমিশনারের নাম ভাঙিয়ে পণ্য আটকে কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার মাধ্যমে চট্টগ্রামে মাত্র ২ বছর অবস্থান করেই প্রায় ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তুহিন।

শিক্ষক পরিবারের সন্তান তুহিন নিজের দুর্নীতির টাকা আড়াল করতে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।

রাজধানীতে বিলাসবহুল জীবন: ২০১৭ সালে রামপুরায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনেন। এরপর চট্টগ্রাম কাস্টমসে থাকাকালীন রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের আলিশান ফ্ল্যাট ক্রয় করেন, যেখানে বর্তমানে তিনি বসবাস করছেন।

গ্রামের বাড়িতে সম্পদের পাহাড়: তার নিজ বাড়ি নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বারোঘর গ্রামে। সৎ মা-বাবা ও ভাই-বোনরা শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত থাকলেও তুহিন সবার নামে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার বেনামী সম্পদ তৈরি করেছেন। মেঝ ভাইয়ের নামে ৪৫ লাখ টাকায় বাড়ি, গ্রামের জমিতে একটি আস্ত ‘পার্ক’ এবং এক দাগেই ২০ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার ডিপিএস এবং এফডিআর রয়েছে।

দুর্নীতির পাশাপাশি তুহিনের ব্যক্তিগত জীবনও নানা বিতর্কে জড়ানো। ২০১২ সালে প্রথম বিয়ে করলেও সরকারি অন্য একটি চাকরির (এসআই) আশায় তা গোপন রাখেন। পরবর্তীতে প্রথম স্ত্রীকে ধোঁকা দিয়ে এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়ান এবং তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করে গুলশানের ফ্ল্যাটে থাকছেন।

এসব সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির বিষয়ে কাস্টম ও ভ্যাট কর্মকর্তা তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন। ফোনের জবাবে তিনি প্রথমে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন:

“কাস্টমস ও ভ্যাটের কম-বেশি সবারই অবৈধ সম্পদ রয়েছে। কারও কম, কারও বেশি।”

তবে এত বিপুল সম্পদ কীভাবে গড়লেন—এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তুহিন। উত্তেজিত কণ্ঠে তিনি বলেন:

“আপনাকে কী উত্তর দিতে হবে? দুদক আছে, আরও সংস্থা আছে, তারা দেখবে। আপনি দেখার কে?”

এই কথা বলেই তিনি সংযোগটি কেটে দেন। একজন সাধারণ নন-ক্যাডার কর্মকর্তার এই বিপুল সম্পদ অর্জন এবং প্রকাশ্য ঔদ্ধত্যের বিষয়ে এখন খতিয়ে দেখার দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।