
একসময়ের ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে গত দেড় দশকে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া এনভয় টেক্সটাইল ও শেলটেক গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার ও কালোটাকা সাদা করার মতো গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কতিপয় গণমাধ্যমকর্মীর এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই ফাইল ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কোটি টাকার গোপন লেনদেনের মাধ্যমে এই বহুল আলোচিত অনুসন্ধান প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত নিষ্পত্তি করে অভিযুক্তদের কার্যত অব্যাহতি দেওয়া হয়।
দুদকের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, কুতুবউদ্দিন আহমেদ, তাঁর স্ত্রী রাশিদা আহমেদ, ছেলে তানভীর আহমেদ এবং মেয়ে সুমাইয়ার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে টাকা স্থানান্তর এবং আবাসন খাতের আড়ালে বিপুল পরিমাণ কালোটাকা বৈধ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। রাষ্ট্রীয় এই দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার সদর দপ্তর থেকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং একজন সহকারী পরিচালককে এর অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের পক্ষে জোরালো তথ্য-প্রমাণ ও নথি মেলা শুরু হলেও হঠাৎ করেই থমকে যায় তদন্তের গতি। অভিযোগ রয়েছে, দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান মমিন-উর রশিদের মেয়াদে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা ও একটি প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে পুরো বিষয়টি আড়াল করা হয়। শেষ পর্যন্ত এক রহস্যজনক প্রক্রিয়ায় অভিযোগের দায় থেকে কুতুবউদ্দিন পরিবারকে নিষ্কৃতি দেয় কমিশন।
অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, কুতুবউদ্দিনের মালিকানাধীন শেলটেক, এনভয় টেক্সটাইল, সিরামিক ও আবাসনসহ ৩০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক উত্থান নিয়ে খোদ রাজস্ব খাতেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে হাউজিং কোম্পানি ‘শেলটেক’-এর মাধ্যমে পুলিশ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অসৎ কর্মকর্তা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের শত শত কোটি টাকার কালোটাকা সাদা করার নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল।
অভিযোগে বলা হয়, রাজধানীর গুলশান, বনানী বা বারিধারার মতো অভিজাত এলাকায় বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট বা ফ্লোর স্পেস বিক্রির ক্ষেত্রে কুতুবউদ্দিনের লিগ্যাল ডিপার্টমেন্ট ক্রেতাদের বিশেষ ‘টেকনিক’ শিখিয়ে দিত। ফ্ল্যাট নির্মাণ ব্যয়ের চেয়েও কম মূল্য রেজিস্ট্রেশন ও হস্তান্তর দলিলে প্রদর্শন করা হতো, যাতে ক্রেতাকে আয়কর নথিতে প্রকৃত বিনিয়োগের তথ্য দেখাতে না হয়।
এর একটি বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়—রাজধানীর একটি বেসরকারি চক্ষু হাসপাতালের এক চিকিৎসক গুলশানের লেকপাড়ে প্রায় ১৩ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট কিনলেও দলিলে মূল্য দেখানো হয় মাত্র সাড়ে ৪ কোটি টাকা। বাকি সাড়ে ৮ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত থাকলেও শেলটেকের কৌশলী গ্যাঁড়াকলে তা কার্যত বৈধ হয়ে যায়।
অনুসন্ধানকারীদের দাবি, কুতুবউদ্দিন ও তাঁর চক্রটি শুধু দেশেই কালোটাকা সাদা করেনি, বরং এই বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশেও পাচার করেছে। কুতুবউদ্দিনের দুবাই ও পর্তুগালে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। দুবাইয়ে বিশাল বিনিয়োগের সূত্র ধরেই তিনি ‘গোল্ডেন ভিসা’ হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক অনিয়মের তথ্য খতিয়ে দেখতে গত বছর (২০২৫ সালের ২১ এপ্রিলের মধ্যে) কুতুবউদ্দিন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের যাবতীয় বিবরণী চেয়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চিঠিও পাঠিয়েছিল দুদক। যার প্রাসঙ্গিক নথিপত্র এখনো সংরক্ষিত রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে শেলটেক গ্রুপের জনসংযোগ কর্মকর্তা তানিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, “আসলে অভিযোগটি একজন মৃত ব্যক্তি করেছিলেন বিধায় নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।”
তবে দুদকের ভেতরের একটি সূত্র বলছে, তদন্তের প্রাথমিক ধাপে যে পরিমাণ আর্থিক লেনদেনের অকাট্য তথ্য ও দলিল সামনে এসেছিল, তা নিয়মতান্ত্রিকভাবে এগোলে দেশের আবাসন খাতের ইতিহাসের অন্যতম বড় কালোটাকা ও মানি লন্ডারিংয়ের চিত্র উন্মোচিত হতো। কিন্তু প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পুরো প্রক্রিয়াটিকেই ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে দেয়।
এদিকে কুতুবউদ্দিনের মতো বড় খেলাড়ির বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ হেলায় নিষ্পত্তি করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দুর্নীতিবিরোধী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, কুতুবউদ্দিন ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগ পুনরায় একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ টিমের মাধ্যমে তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে, অতীতের সেই সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানটি ঠিক কার ইশারায় থেমে গিয়েছিল এবং কোন অনৈতিক প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের খালাস দেওয়া হলো—তা খতিয়ে দেখে দোষী দুদক কর্মকর্তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।













