১২ হাজার কোটি টাকার মামলায় ফেঁসেছেন ৪০ হাজার জমি-ফ্ল্যাটের ক্রেতা

ঢাকা ও দেশের অন্যান্য বড় শহরে জমির দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় তুলনামূলক কম খরচে জমি ও ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার আকর্ষণীয় উপায় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভূমি-অংশীদারত্বভিত্তিক আবাসন প্রকল্প। তবে এই মডেল ঘিরে প্রতারণার অভিযোগও বাড়ছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, অনিবন্ধিত জমির শেয়ার বিক্রি, অননুমোদিত প্রকল্প এবং একই জমির শেয়ার একাধিক বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রি করে তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের আদালতগুলোতে ভূমি-অংশীদারত্বভিত্তিক আবাসন জালিয়াতির ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এসব মামলায় প্রায় ৪০ হাজার ক্রেতা জড়িত। মামলাগুলোর আর্থিক মূল্য প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।

ক্রেতাদের অনেকে পরে জানতে পেরেছেন, তাঁদের কেনা জমির শেয়ার অন্যদের কাছেও বিক্রি করা হয়েছে।

২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ হলিস্টিকের বিরুদ্ধে

ঢাকায় ১১টি প্রকল্পে জমির অংশীদারত্ব ও ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৪৭০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হলিস্টিক হোম বিল্ডার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে।

তদন্তের পর অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হায়দার কবির মিঠুন মে মাসে গ্রেপ্তার হন। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তরখানের একটি প্রকল্পে নয়তলা ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১০ কাঠা জমির ৩৬টি শেয়ার বিক্রি করেছিল কোম্পানিটি।

এই প্রকল্পের একজন বিনিয়োগকারী আসাদুল ইসলাম রুমন বলেন, ২০২২ সালে তিনি একটি চুক্তি করেন এবং একটি শেয়ারের জন্য ১৫ লাখ টাকা দেন।

চুক্তি অনুযায়ী, প্রত্যেক ক্রেতাকে ১ হাজার ২২০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। চুক্তিতে আরও বলা হয়, জমি অধিগ্রহণের পর বিনিয়োগকারীরা যৌথভাবে ভবন নির্মাণ করবেন।

কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের একটি নকশাও দেখিয়েছিল। রুমনের অভিযোগ, পরে তাঁরা জানতে পারেন, সেটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ভবনের নকশার জাল কপি।

রুমন বলেন, ৩৬ জন বিনিয়োগকারীই ২০২৩ সালের নভেম্বরের মধ্যে তাঁদের কিস্তির টাকা পরিশোধ করেছিলেন।

তিনি বলেন, “আমরা পরে জানতে পারি, একই শেয়ার আরও ৪০ জনের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল।”

পরে ক্রেতাদের নামে জমি নিবন্ধন করতে গড়িমসি করে কোম্পানিটি। একপর্যায়ে বিনিয়োগকারীরা জানতে পারেন, তাঁদের আবাসন প্রকল্পের অংশ হিসেবে জমিটি দেখাতে সেখানে একটি ভাড়া করা জমিতে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছিল।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে হোলিস্টিক হোম বিল্ডার্সের এ ধরনের সাতটি প্রকল্পে ৪৭০ জন গ্রাহক বিনিয়োগ করেছেন।

গত ১৩ অক্টোবর এই প্রতিবেদক উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে কোম্পানিটির কার্যালয়ে গিয়ে সেটি বন্ধ দেখতে পান। নিরাপত্তাকর্মী মো. জিয়াউল জানান, মার্চ মাসে ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা ভাঙচুর করার পর থেকে কার্যালয়টি বন্ধ রয়েছে।

আবাসন প্রকল্পের নামে বিক্রি সরকারি জমি

সিলেটের লামাবাজারে ৪০ কাঠা জমিতে অংশীদারত্বভিত্তিক আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৫০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৯০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘স্বপ্ন ছায়া আবাসন’-এর বিরুদ্ধে।

প্রকল্পটিতে বিনিয়োগকারী একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মহসিন হোসেন এই সংবাদপত্রকে বলেন, ২০১৭ সালে স্থানীয় সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে ওই জমিতে ১০ তলা ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বিনিয়োগকারীদের ১ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল। জানা গেছে, ২০২০ সালের শুরুর দিকেই সব শেয়ার বিক্রি হয়ে যায়।

পরে জমি নিবন্ধনের বিষয়ে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম খায়রুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বারবার বিলম্বের মুখে পড়েন বলে অভিযোগ করেন মহসিন।

তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা পরে জানতে পারেন, জমিটি সরকারি খাসজমি। তাঁর অভিযোগ, শামীম ও তাঁর সহযোগীরা কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার সহায়তায় সরকারি জমিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন আবাসন প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

মহসিনের ভাষ্য, পরে প্রকল্পের টাকা নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান শামীম।

সিলেট অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট গ্রুপের চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেন বলেন, তাঁরা জমির অংশীদারত্ব নিয়ে জালিয়াতির ৫০টির বেশি অভিযোগ পেয়েছেন।

তিনি বলেন, অভিযুক্ত কোম্পানি ও ব্যক্তিরা সংগঠনের সদস্য না হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।

অভিজ্ঞতা নেই, এমন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

ঢাকায় কথিত জালিয়াতির ২০টি ঘটনা তদন্ত করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ১৬টির সঙ্গে এমন প্রতিষ্ঠান জড়িত, যেগুলো আবাসন ব্যবসার নামে কার্যক্রম চালালেও রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সদস্য নয়।

হোলিস্টিক হোম বিল্ডার্স এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের নিবন্ধকের কার্যালয়ে নিবন্ধিত হলেও রিহ্যাবের সদস্য নয়।

আফতাবনগরে ১০০ জনের বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে শেয়ার ল্যান্ড বিল্ড হোমের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটিও রিহ্যাবের সদস্য নয়।

মেরুল বাড্ডায় কার্যক্রম চালানো ‘আমার বাড়ি আমার ঘর’ নামের আরেকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রায় ৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৬৫ জন মামলা করেছেন।

তদন্তে দেখা গেছে, এসব বিতর্কিত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেক কোম্পানিরই আগে ফ্ল্যাট নির্মাণ বা প্লট বিক্রির অভিজ্ঞতা ছিল না।

ঢাকার বাইরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে করিডর ঘিরেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ ধরনের ১০০টির বেশি প্রকল্প গড়ে উঠেছে বলে জানা গেছে।

মুন্সিগঞ্জ জেলা জজ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, জমির শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি আর্থিক মূল্যের ৫৩৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আদালত সূত্রের দাবি, ২৮৬ জন ব্যক্তি এসব অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত।

আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পাবলিক প্রসিকিউটর) আব্দুল আজিজ বলেন, কেরানীগঞ্জ, লৌহজং ও সিরাজদিখানসহ বিভিন্ন এলাকার ঘটনা নিয়ে এসব মামলা হয়েছে।

নতুন আবাসনের চাহিদার কারণে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের আশপাশে এক হাজারের বেশি আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। প্রতারক চক্রগুলো এই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে বলে জানান তিনি।

ঢাকাতেই সবচেয়ে বেশি মামলা

সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বিচারাধীন ৯ হাজার ৮২৩টি মামলার মধ্যে ৫ হাজার ৯৪৮টি ঢাকা মহানগর ও জেলা আদালতে রয়েছে। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ৩৮৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার ২৮৬টি এবং সিলেটে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ২১৩টি মামলা রয়েছে।

এ ছাড়া গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

আইন আছে, প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

রিহ্যাবের সাবেক সহসভাপতি কামাল মাহমুদ বলেন, রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৯ ও ২০ ধারায় নিবন্ধন ছাড়া আবাসন ব্যবসা পরিচালনা এবং অনুমোদন ছাড়া প্রকল্প উন্নয়ন বা বিক্রির বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ক্রেতার অজান্তে চুক্তিবদ্ধ সম্পত্তি অবৈধভাবে অন্য পক্ষের কাছে বিক্রির শাস্তির বিধান রয়েছে আইনের ২৪ ধারায়। কোনো কোম্পানি অপরাধ করলে ৩১ ধারায় এর মালিক, পরিচালক ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিধানও রয়েছে।

প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা ফৌজদারি মামলা করতে পারেন। তবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন এ ধরনের সমস্যা সমাধানের দায়িত্বে থাকা একটি সেল অভিযোগকারীদের কার্যকর প্রতিকার দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কামাল মাহমুদ।

আবাসন প্রকল্প তদারকির দায়িত্ব রাজউকেরও রয়েছে। তবে রাজউকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে প্রতারক চক্রের যোগসাজশ থাকার অভিযোগও উঠেছে।

রিহ্যাবের সভাপতি ডা. মো. আলী আফজাল বলেন, অভিযুক্ত কোম্পানিগুলো সমিতির সদস্য না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সংগঠনটির পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বিনিয়োগের আগে ডেভেলপারের রিহ্যাব সদস্যপদ, রাজউকের অনুমোদন এবং জমির মালিকানার কাগজপত্র যাচাই করে নেওয়ার জন্য ক্রেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

একই সঙ্গে রাজউক ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান আফজাল।

রাজউকের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের সদস্য এবং সংস্থাটির মুখপাত্র মো. শাহিনুর আলম বলেন, অননুমোদিত আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কয়েকটি অবৈধ ভূমি-অংশীদারত্বভিত্তিক প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে রাজউক আরও কঠোর ব্যবস্থা নেবে।