চট্টগ্রাম বন্দরে ফ্যাসিস্ট দালাল ইরফান খান শীর্ষ দুই পদে!

নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি’—বাংলার এই প্রবাদ বাক্যটির বাস্তব প্রতিফলন যেন দেখা যায় দেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্ট আমলে কিছু সুবিধাভোগী কর্মকর্তার মাঝে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময়জুড়ে যারা নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের চেয়ে রাজনৈতিক তোষণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে ব্যস্ত ছিলেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর তারা নিজেদের খোলস পাল্টে আবারও টিক টিকে থাকার নোংরা খেলায় মেতে উঠেছেন। যোগ্যতা ও দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক বলয় আর ক্ষমতার অপব্যবহারকে হাতিয়ার বানিয়ে যারা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন, তাদেরই একজন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিতর্কিত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইরফান খান।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য বজায় রেখে চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা বর্তমানে বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এবং ভোল পাল্টে নিজেকে সুবিধাভোগী হিসেবে টিকিয়ে রাখার অপচেষ্টা নিয়ে বন্দর চত্বরে এখন তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে।

আওয়ামী ঘরানার প্রভাব এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ লতিফের সঙ্গেও তার ঘনিষ্টতা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ভবন ও এর আশপাশের এলাকায় এম এ লতিফের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে বন্দর ভবনে একচ্ছত্র ক্ষমতার অপব্যবহার করতেন কর্মকর্তা ইরফান খান।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, ইরফান খান কেবল নিজের দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেই ক্ষান্ত থাকেননি; বরং বন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বিষয় এবং বিশেষ করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতেন। বন্দর ভবনে তার কথাই ছিল শেষ কথা—এমন পরিবেশ তৈরি করে তিনি নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছিলেন।

নিয়োগ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ

ইরফান খানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি এসেছে বন্দরের বিভিন্ন স্তরে জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, জুনিয়র আউটডোর ক্লার্ক, খালাসি এবং অন্যান্য ক্যাটাগরির পদে লোক নিয়োগের সময় তিনি সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে হস্তক্ষেপ করতেন। নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাদের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন্দরের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানান, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় না রেখে রাজনৈতিক কোটায় এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হতো। এই পুরো সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কাঠি নাড়তেন ইরফান খান। অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, যদি নিরপেক্ষ কোনো তদন্ত পরিচালনা করা হয়, তবে বিগত বছরগুলোতে বন্দর ভবনে হওয়া প্রতিটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার নথিপত্র, ব্যাংক লেনদেন, অডিট রিপোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট ফাইলপত্র যাচাই করলেই ইরফান খানের অনিয়মের পাহাড়সম চিত্র বেরিয়ে আসবে।

ভোল পাল্টে নতুন রূপ: ‘কাক হয়ে ময়ূরের পালক লাগানোর’ অপচেষ্টা

রাজনীতির চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে গিরগিটির মতো রঙ বদলানোর এক নিখুঁত নজির স্থাপন করেছেন এই কর্মকর্তা। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। কিন্তু ইরফান খান যেন দমে যাওয়ার পাত্র নন।

অভিযোগ উঠেছে, বিগত দিনে যারা বুক ফুলিয়ে নিজেদের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও এম এ লতিফের ঘনিষ্ট অনুসারী বলে জাহির করতেন, বর্তমান সময়ে এসে সেই ইরফান খানই নিজেকে বিএনপিঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করার হাস্যকর অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘ইরফান খান এখন কাক হয়ে ময়ূরের পালক লাগিয়ে নিজের ভোল পাল্টে বিএনপি’র মিথ্যা তকমা লাগাবার চেষ্টা করছেন।’ বন্দরের ভেতরে ও বাইরে তার এই সুবিধাবাদী চরিত্র নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশ্ন, যে মানুষটি বিগত সরকারের সময় বন্দরের পদ-পদবী ব্যবহার করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, সে কীভাবে রাতারাতি দল বদল করে বহাল তবিয়তে শীর্ষ পদে টিকে থাকে?

দেশত্যাগী স্বৈরাচারকে ফেরাতে অর্থায়নের চাঞ্চল্যকর তথ্য

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো একটি সংবেদনশীল ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বসে ইরফান খান কেবল নিজের আখের গোছাননি, বরং দেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রেও লিপ্ত ছিলেন। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে তার মতো আরও যেসব কর্মকর্তা বিগত দিনে আওয়ামী লীগের দালালি করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করেছেন ইরফান খান। এই সংগৃহীত অর্থ পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে পুনরায় দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি এবং বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন গোপন ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডে একজন সরকারি কর্মকর্তার জড়িত থাকার বিষয়টি যদি সত্যি হয়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক অপরাধ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি।

সম্পদের পাহাড় ও বিলাসবহুল জীবনযাপন

ইরফান খানের ব্যক্তিগত সম্পদের বিষয়েও অনুসন্ধানের দাবি জোরালো হচ্ছে। সাধারণ একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে কীভাবে তিনি স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হলেন, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামে তার বা তার পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো বেনামী ফ্ল্যাট, প্লট, বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা বিদেশে কোনো সম্পদ বা হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের তথ্য রয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ইরফান খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে বা কর্মস্থলে সরাসরি পাওয়া যায়নি। তার ঘনিষ্ঠদের দাবি, তিনি চরম অহংকারী ও দেমাগী স্বভাবের। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি মাঝেমধ্যেই দাপ্তরিক লোকজনের সামনে হুমকি দিয়ে বলেন, “এই দিন দিন না, দিন আরও আছে। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসুক, তখন চট্টগ্রাম বন্দরের কার কী অবস্থা করি, তা দেখে নেব।” একজন সরকারি চাকুরিজীবীর মুখে এমন প্রকাশ্যে রাজনৈতিক হুমকি দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, তার ঔদ্ধত্য কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার দাবি

চট্টগ্রাম বন্দরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত প্রতিষ্ঠানে ঘাপটি মেরে থাকা এমন দুর্নীতিবাজ, সুবিধাবাদী ও রাষ্ট্রবিরোধী চক্রের সদস্যকে শীর্ষ পদে বহাল রাখা বন্দর ও দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বন্দর সচল রাখতে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইরফান খানের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া অপরিহার্য।