
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সেশন চার্জের টাকা তছনছ করে বাংলাদেশ গার্লস গাইড অ্যাসোসিয়েশনে একক ‘রামরাজত্ব’ কায়েম করেছেন জাতীয় কমিশনার কাজী জেবুন্নেছা বেগম। বালিকাদের জীবন গড়ার মূল খাত ‘প্রশিক্ষণ’ সম্পূর্ণ সংকুচিত করে সরকারি কোটি কোটি টাকা নামমাত্র সভা-সেমিনার ও ওরিয়েন্টেশনের নামে পকেটস্থ করা, বিলাসিতার জন্য কোটি টাকার পাজেরো জিপ ব্যবহার করেও প্রতি সভার বিপরীতে দ্বিগুণ যাতায়াত ভাতা (টিএ) ও খাবার খরচ উত্তোলন এবং নিজের একক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে ১৫টি সাব-কমিটির সব কয়টিতে নিজেই আহ্বায়ক সেজে বসার এক নজিরবিহীন উৎসব চলছে ঐতিহ্যবাহী এই সংস্থায়। এখানেই শেষ নয়; সরকারি জমি বেদখল হতে দিয়ে ঢাকার বাইরে নিজের জন্য কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল ভিআইপি রুম তৈরি, পছন্দের সদস্যকে সুবিধা দিতে বিউটি পার্লারের ভাড়া মওকুফ, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা ছাড়াই আড়াই কোটি টাকা অনিয়মিত ব্যয় এবং শিক্ষা অডিট অধিদফতরের ভয়ংকর সব দুর্নীতিসংবলিত সরকারি অডিট রিপোর্ট ক্ষমতার জোরে ধামাচাপা দেওয়ার মতো মারাত্মক সব অভিযোগ উঠেছে এই শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। দাপ্তরিক নথিপত্র এবং অডিট রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের কষ্টার্জিত অর্থ ও সরকারি তহবিলকে নিজের ব্যক্তিগত চারণভূমিতে পরিণত করে পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন তিনি।
তথ্য বলছে, সারাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের আওতাধীন সকল স্কুল ও কলেজে গার্ল গাইডস্ ও রেঞ্জার কার্যক্রম গতিশীল করতে সেশন চার্জের সঙ্গে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলক ১৫ টাকা করে দিতে হয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সেই কষ্টার্জিত কোটি কোটি টাকা তছনছ করছে বাংলাদেশ গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশন। জাতীয় কমিশনার জেবুন্নেছা নিজের জন্য কোটি টাকার পাজেরো গাড়ি, অফিস সাজসজ্জায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়, গার্লস গাইডের জমি বেহাত হওয়া, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে থাকা ভবনের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং প্রশিক্ষণে টাকা ব্যয় না করে সভা-সেমিনারে অর্থ ব্যয় করার রেওয়াজ তৈরি করেছেন। কেবল তাই নয়, নিজেই এসব সভা-সেমিনারে অতিথি হয়ে টিএ-ডিএ বাবদ অর্থ নেন এবং গার্লস গাইডের দুর্নীতি আড়াল করতে সরকারি অডিটও তিনি একপর্যায়ে বন্ধ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কয়েক বছরের বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও অধিদপ্তর থেকে বরাদ্দ দেওয়া কোটি কোটি টাকার সিংহভাগই মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ গাইড ও হলদে পাখিদের প্রশিক্ষণে ব্যয় করা হয়নি। গাইড অ্যাসোসিয়েশনের মূল লক্ষ্য কিশোরী ও বালিকাদের আত্মনির্ভরশীল ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হলেও বাস্তবমুখী মৌলিক প্রশিক্ষণে অর্থ বরাদ্দ না করে সভার নামে অর্থ উড়ানো হয়েছে। নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে হলদে পাখির জন্য বরাদ্দকৃত ২ কোটি টাকার মধ্যে প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ, অথচ সভা ও সেমিনারে খরচ দেখানো হয়েছে ১৭ শতাংশ টাকা। একই ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায় ২০১৯-২০ অর্থবছরেও, যেখানে হলদে পাখির ৫ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে প্রশিক্ষণে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় করে সভা-সেমিনারে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র মিলেছে ২০২১-২২ অর্থবছরে, যেখানে হলদে পাখি প্রকল্পের মোট ৫ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ বা ৪০ লক্ষ টাকা, অথচ সমন্বয় ও মতবিনিময় সভার নামেই উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ২০ শতাংশ অর্থাৎ ১ কোটি টাকা। একই অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে প্রাপ্ত ২৬ লাখ ৪২ হাজার টাকার মধ্যে প্রশিক্ষণে ব্যয়ের হার ছিল শূন্য শতাংশ, পক্ষান্তরে সভা ও সেমিনারে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬৫ দশমিক ৯ শতাংশ টাকা। এ ছাড়া কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে প্রাপ্ত ১ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে প্রশিক্ষণে ব্যয় করা হয়েছে মাত্র ১১ শতাংশ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরের নথিতে দেখা যায়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের প্রাপ্ত ১ কোটি টাকার পুরোটাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ওরিয়েন্টেশন সভার নামে ব্যয় দেখানো হয়েছে, যার পরিমাণ যথাক্রমে ৯১ লক্ষ ৯৮ হাজার টাকা এবং ৮ লাখ ২ হাজার টাকা। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে অর্থবছরগুলোতে প্রশিক্ষণের মূল খাতকে অবমূল্যায়ন করে সভার অজুহাতে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
আর্থিক এই অনিয়মের পাশাপাশি জাতীয় কমিশনার কাজী জেবুন্নেছা বেগমের বিরুদ্ধে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিনব কৌশলের প্রমাণ মিলেছে। অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে থাকা ১৫টি সাব-কমিটির প্রত্যেকটিতে তিনি নিজেই আহ্বায়ক বা কনভেনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন দক্ষ ব্যক্তিকে এসব কমিটির দায়িত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও আর্থিক ফায়দা লুটতেই তিনি সব পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন বলে অভিযোগ। তিনি সার্বক্ষণিক ব্যবহারের জন্য অ্যাসোসিয়েশনের একটি বিলাসবহুল পাজেরো জিপ গাড়ি সুবিধা পান, যার জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ প্রতিষ্ঠান বহন করে। অথচ এই সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে প্রতিটি সাব-কমিটির সভায় যোগদানের বিপরীতে তিনি নিয়মিত যাতায়াত ভাতা বা টিএ এবং খাবার খরচ বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থ উত্তোলন করেন। প্রতিদিন এক বা একাধিক মিটিং দেখিয়ে এভাবে প্রতিমাসে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েশনের গত ২৬ জুন ২০২৬ তারিখের বাজেট ব্যবস্থাপনা সাব কমিটির সভার একটি যাতায়াত বিল বিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জাতীয় কমিশনার কাজী জেবুন্নেছা বেগম ওই সভায় যোগদানের জন্য ১ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা গ্রহণ করেছেন এবং স্বহস্তে বিলে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে একই সভায় অন্যান্য সাধারণ সদস্যরা ৫০০ টাকা করে ভাতা নিয়েছেন। দাপ্তরিক যোগাযোগের নামে প্রতি মাসে নিয়মিত ২ হাজার টাকা করে মোবাইল ফোন ভাতাও নিচ্ছেন তিনি।
বাংলাদেশ গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনে অডিট করতে গিয়ে ব্যাপক অনিয়মের খোঁজ পেয়েছিল শিক্ষা অডিট অধিদফতর। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশন আইন ১৯৭৩-এর ধারা লঙ্ঘন করে অনিয়মিতভাবে জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি ও বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক জনবল নিয়োগে ১৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন সরকারি বিল হতে নির্ধারিত হারে ভ্যাট কর্তন না করায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া অস্বাভাবিক হারে বাল্ক এসএমএসের বিলে ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ফেরদৌসী আক্তার ডলিকে বিশেষ সুবিধা দিতে তার স্বত্বাধিকারী ‘ডলি বিউটি পার্লার’-এর ভাড়া কম হারে আদায় করায় গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন না করেই ২ কোটি ৪৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা অনিয়মিতভাবে ব্যয় করার ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে অডিট রিপোর্টে। তবে রহস্যজনক কারণে এই অডিট রিপোর্ট পরবর্তীতে আর আলোর মুখ দেখেনি এবং এর সূত্র ধরে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।
অনিয়মের থাবা কেবল অর্থ লোপাটেই সীমাবদ্ধ নেই, গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার বারইপাড়ায় অবস্থিত গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের মূল্যবান ক্যাম্প সাইটের জমিও এখন সংকটে। সরকার হতে প্রাপ্ত এই জমির চারপাশে কোনো সীমানা বেড়া বা দেয়াল না থাকায় অনেক জমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে এবং সেখান থেকে চুরি হয়ে গেছে দামি আসবাবপত্র। বিভিন্ন সময়ে জমির চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখার প্রস্তাব উঠলেও জাতীয় কমিশনার জেবুন্নেছা তাতে কোনো কর্ণপাত করেননি। ঢাকায় সুসজ্জিত অফিস থাকার পরেও চারতলা ক্যাম্প ভবনের দোতলার মূল কাঠামো ভেঙে জেবুন্নেছা নিজের জন্য বিলাসবহুল ভিআইপি কক্ষ বানিয়েছেন। নির্মাণ কাজসহ কক্ষে দামি আসবাবপত্র, এসি, অ্যাটাচড টয়লেট, গিজার ইত্যাদি বসানোর কাজে অপচয় করা হয়েছে কয়েক লক্ষ টাকা। শুধু তাই নয়, ঢাকার কেন্দ্রীয় গাইড হাউজ প্রাঙ্গণে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রতিদিন অনেকগুলো ব্যক্তিগত বা অননুমোদিত গাড়ি ধোয়ার কাজ চলে, যার তদারকি করেন জেবুন্নেছার ব্যক্তিগত গাড়িচালক। আর এই গাড়ি ধোয়ার কারণে প্রতি মাসে প্রতিষ্ঠানটিকে পানির বিল দিতে হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। এ ছাড়া সারাদিন জেবুন্নেছা অফিস না করলেও সন্ধ্যার পর থেকে তিনি অফিস করা শুরু করেন। আর গভীর রাত পর্যন্ত অফিসের নামে চলে আড্ডা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জাতীয় কমিশনারের এই একনায়কতন্ত্র ও আর্থিক অনিয়মের কারণে মাঠ পর্যায়ে গার্লস গাইডের কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। বালিকাদের মৌলিক প্রশিক্ষণের তহবিল কেটে যেভাবে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে টাকা তোলা হচ্ছে, তাতে প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব রক্ষার্থেই এখন অতি দ্রুত শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় কমিশনার কাজী জেবুন্নেছা বেগমের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, প্রতিবেদকের পরিচয় জেনেই তিনি ফোন কেটে দেন। এরপর বারবার কল করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। একই বিষয়ে কথা বলতে সংগঠনটির জেনারেল সেক্রেটারি তানজিনা বিনতে মোশারফের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলে তিনিও কলটি রিসিভ করেননি।















