
আয়কর রির্টানে অসত্য তথ্য দিয়ে প্রতারণা, প্লট-ফ্ল্যাট থাকার পরও পূর্বাচলে জমি নিজের নামে জমি নেওয়া, কাজ বাদ দিয়ে তদবির বাণিজ্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান হওয়ার পর কর্মকর্তাদের মধ্যে গ্রুপিং তৈরি, অসৎ কর্মকর্তাদের নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি, সর্বশেষ ছাত্রজীবনে জামায়াত ঘনিষ্ঠতা থাকা এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান অর্ন্তবর্তী সরকারকে বিভ্রান্ত করতে পিছুপা হননি। তিনি সরকারকে বিপদে ফেলতে অপকৌশলে সরকার ও এনবিআর কর্মকর্তাদের মুখোমুখি করে দেন। এতে বিপদে পড়ে সরকার। এর জেরে চাকরি হারান অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারি। এছাড়া চাকরি মেয়াদ ফুরানোর আগে আবারও চেয়ারম্যান হওয়ার লোভে নিজেকে বিএনপি ঘনিষ্ঠ প্রমাণ করতে জোর লবিং করেন তিনি। যদিও সরকারের দুরদর্শীতায় তা ধোপে টেকেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, এনবিআর দুই ভাগ করার ইস্যুতে বিসিএস আয়কর ও বিসিএস কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে শুরু থেকেই অসন্তোষ ছিলো। আবদুর রহমান খান শুরু থেকেই এই অসন্তোষ বাড়ানোর পথে হেঁটেছেন। মূলত সরকারকে বেকায়দায় ফালানোই ছিলো তার উদ্দেশ্য। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। এনবিআর কর্মকর্তারা ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে আন্দোলনের পথে হাঁটেন।
আন্দোলন দমনের জায়গায় আবদুর রহমান খান আন্দোলনকে আরো উসকে দেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের বদলি করে তিনি আগুণে প্রথম ঘি ঢালা শুরু করেন। এরপর থেকে আন্দোলন আরো জোরালো হতে থাকে। কর্মবিরতি, কলমবিরতি থেকে আন্দোলনের পরিণতি আমদানি-রফতানি বন্ধে রূপ নেয়। দাবি ওঠে চেয়ারম্যানের পদত্যাগের।
পরে সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় আন্দোলন থেমে যায়। তখন চাকরি খাওয়ার নেশায় মত্ত হয়ে ওঠেন আবদুর রহমান। সৎ ও মেধাবী চারজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠান তিনি। তাদের মধ্যে তিনজন ছিলেন এনবিআরের সদস্য ও একজন কমিশনার। এছাড়া বিভিন্ন পদের প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা পেয়ে তারা আবারও চাকরিতে বহাল হন। তার এই তোপ থেকে রেহাই পায়নি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিও। প্রশ্ন উঠেছে, এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিম্নপদস্থ কর্মচারিদের শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে।
এদের মধ্যে একজন ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের সিপাই মো. সালেক খান। তাকে বিধি না মেনেই কমিশনারকে চাপ দিয়ে বরখাস্ত করা হয়েছিল। কমিশনার জুয়েল আহমেদের আদেশে কর্মকর্তাদের বদলির আদেশ ছিড়ে ফেলার অপরাধে তাকে বরখাস্ত করা হয়। যা আইন ও বিধি মোতাবেক সঠিক নয়। সরকারি কর্মচারিকে বরখাস্ত করতে হলে তাকে শুনানির সুযোগ দেননি। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই নির্দোষ প্রমাণ হওয়ায় আগের আদেশ বাতিল করা হয়। তবে কালো আইনের আশ্রয় নেন সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান। একইদিন রাতে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে সালেক খানকে চাকরি হতে অবসরে পাঠিয়ে দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, আন্দোলনের সময় সারাদেশের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারি অংশ নিয়েছিলেন। তারা বলেন, সালেক খানকে ষড়যন্ত্র করে অবসরে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত এ অন্যায় সিদ্ধান্ত থেকে মুক্ত করে তাকে চাকরিতে বহাল করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আন্দোলনের সময় আয়কর ও কাস্টমস বিভাগের হাজার-হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারি অংশ নেন। অংশগ্রহনের অপরাধে সালেক খানকে অবসরে পাঠালে বাকিদের ক্ষেত্রেও একই আইন অনুসরণ করা উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সালেক খান কোনো বদলির আদেশ ছেঁড়েননি। অথচ তার নিয়োগকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত কমিশনার মানস কুমার বর্মনের সঙ্গে কমপ্লিট শাটডাউন ব্যানারে পুরো কমিশনারেটের সবাই অংশ নিয়েছেন। অথচ কিছুদিন পর অর্থের বিনিময়ে কমিশনার পদমর্যাদায় পদোন্নতি পেয়েছেন মানস কুমার।
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান কখনোই রাজস্ব আদায়ে মনযোগী ছিলেন না। তিনি তার ব্যাচে পিছিয়ে থাকায় ছোট পদ থেকেই অবসরে যাওয়ার শঙ্কায় থাকতেন। আওয়ামী লীগের আশীর্বাদে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ে উপ-সচিব হিসেবে যোগ দেওয়ার ১০ বছরের মাথায় সচিব পদে পদোন্নতি পান। পদোন্নতির আগে শেখ রেহানার তদবিরে ব্যাংকিং বিভাগের সচিব হন। তার অসৎ কর্মকা-ে দেশের ব্যাংকিং বিভাগ এখনো ভুগছে।
নিজে আয়কর ক্যাডারের কর্মকর্তা হলেও আবদুর রহমান খান তার করনথিতে বছরের পর বছর অসত্য তথ্য দিয়েছেন। ব্যক্তিগত খরচ, সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেন বিষয়ে উল্লেখ করা তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে কোনভাবে মেলে না। ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ এই তিন করবর্ষে তিনি প্রতিবছর তার পরিবারের খাবার, কাপড়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ দেখিয়েছেন মাত্র এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সেখানে তার খরচে কোন প্রভাব পড়েনি। এছাড়া দুটি ব্যক্তিগত গাড়ির তেল, চালক ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে বছরে এক লাখ ৯০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা। ঢাকার বাস্তবতায় শুধু একজন গাড়িচালকের বার্ষিক বেতনই প্রায় আড়াই লাখ টাকা। তেলের খরচ ধরা হলে খরচ আরো বেশি।
ঢাকার উত্তরখানে তার পৈত্রিক সম্পত্তি থাকলেও পূর্বাচলে রাজউকের একটি সরকারি প্লটও নিয়েছেন। তবে রাজউকের প্লট পেতে ঢাকায় ফ্ল্যাট বা জমি না থাকার মুচলেকা দিতে হয়। এছাড়া তার নামে ঢাকার লালমাটিয়া, বসুন্ধরা, মৌচাক ও ধানমন্ডিতে জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। এসব সম্পত্তির মূল্য যেমন দেখানো হয়েছে তাও অস্বাভাবিক। স্ত্রীর নামে কেনা বসুন্ধরায় তিন কাঠা জমির দাম দেখিয়েছেন মাত্র ৩২ লাখ টাকা। রিটার্নে খরচ কম দেখানো অনেক সময় অবৈধ আয় বৈধ করার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এছাড়া ২০২০-২১ করবর্ষে সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান এক কোটি ২০ লাখ টাকা বিভিন্নজনকে ধার দিয়েছেন। সেই তালিকায় আছেন এনবিআরের সাবেক দুই কর কমিশনার-মাহবুবুর রহমান ও একেএম হাসানুজ্জামান। এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগেও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল।
এনবিআরের ইতিহাসে তার আমলেই সবচেয়ে বড় রাজস্ব ঘাটতি দেখেছে দেশ। এসময় এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে ঘাটতি। জানা গেছে, ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ আদায় করেছেন। ফলে ব্যবসায়ীরা নিয়মিত পাওনা রাজস্ব পরিশোধ করেন না।
সিএনডএফ লাইসেন্স দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকলেও এতে বারবার বেআইনিভাবে বাধা দিয়েছেন আবদুর রহমান। অভিযোগ উঠেছে, কর্মকর্তাদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করতে না পেরে তিনি শেষমেষ বেআইনিভাবে পুরো পরীক্ষাই বন্ধ করে দিয়েছেন। সিএন্ডএফ লাইসেন্সের লিখিত পরীক্ষার পরপরই সাবেক এই চেয়ারম্যান কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির মহাপরিচালকের কাছে ১১০ জনের তালিকা দিয়ে দাবি করেন, তালিকাটি সরকারের একজন মন্ত্রীর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। এ তালিকার প্রার্থীদের পাস করাতে না পারলে তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হবে না।
জানা গেছে, গত ১৬ মে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় দুই হাজার ৫২১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২১০ জন পাস করেন। কিন্তু আরও ১১০ জনকে পাস করাতে চাপ দেওয়া হয়। এতে সাড়া না দেওয়ায় লিখিত পরীক্ষার ফলাফল আটকে রাখা হয়। বিধিমালা অনুযায়ী, লিখিত পরীক্ষার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফল প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করা হয়নি।















