রেলমন্ত্রীকে অন্ধকারে রেখে ৩২কোটির ইঞ্জিন এবার ৮০ কোটি টাকায় কেনার মেগা পরিকল্পনা পুরোনো সিন্ডিকেটের

২০২০ সালে সরকারের চুক্তি ভঙ্গ করে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে নিম্নমানের ৩০টি মিটারগেজ (এমজি) লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ক্রয়ের মাধ্যমে সরকারের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করা হয়েছিল। বর্তমানে রেলওয়ের ‘৩০xx’ সিরিজের এই ইঞ্জিনগুলোর সিংহভাগই বিকল হয়ে ওয়ার্কশপে পড়ে আছে। এই নজিরবিহীন জালিয়াতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা চলমান থাকলেও থেমে নেই রেলের সেই প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ চক্র।

অভিযোগ উঠেছে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া সংস্কার উদ্যোগকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, বর্তমান রেলমন্ত্রীকে অন্ধকারে রেখে আবারও হুন্দাই রোটেমকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ছক কষেছে রেলওয়ের একটি চক্র। এবার দোহাজারী-কক্সবাজার লাইন প্রকল্পের আওতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে আরও ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন ক্রয়ে মেগা দুর্নীতির আয়োজন চূড়ান্ত করা হয়েছে। যেখানে আগের ইঞ্জিনের চেয়ে আড়াই গুণ বেশি দাম ধরে সরকারের প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা লোপাটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, সাবেক ডিজি মো. শামসুজ্জামান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী, সাবেক এডিজি (ডেভেলপমেন্ট) মোহাম্মদ হাসান মনসুর এবং সাবেক এডিজি ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদারসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই দুর্নীতির জাল বুনেছিল।

দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পের জন্য নতুন ৩০টি ইঞ্জিনের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) পাস করা হয়েছিল ইঞ্জিনের কারিগরি স্পেসিফিকেশন (Technical Specification) সম্পূর্ণ ফাঁকা রেখে—যা রেলের ইতিহাসে একটি বিরল ও নজিরবিহীন ঘটনা। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, যেন অন্য কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে না পারে এবং হুন্দাই রোটেম এককভাবে কাজটি পায়।

পরবর্তীতে গণমাধ্যমে এই নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি হলে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেল উপদেষ্টা ও সহকারী স্পেশাল উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন অভিজ্ঞ অধ্যাপকের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি কয়েক দফা বৈঠক করে একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানের স্পেসিফিকেশন চূড়ান্ত করে, যা সবার জন্য উন্মুক্ত (Open Tender) ছিল।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান রেলমন্ত্রীর অজান্তেই রেলের সেই পুরোনো সিন্ডিকেট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কমিটির দেওয়া চূড়ান্ত রিপোর্টটি ধামাচাপা দিয়েছে। তারা আগের সেই বিতর্কিত ও হুন্দাই রোটেম-বান্ধব ত্রুটিপূর্ণ স্পেসিফিকেশন বহাল রেখে টেন্ডার ডকুমেন্টস পাস করিয়ে এডিবির (ADB) অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে।

৩২ কোটির ইঞ্জিন এবার ৮০ কোটি টাকা!
অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ২০২০ সালে কেনা হুন্দাই রোটেমের নিম্নমানের প্রতিটির ইঞ্জিনের মূল্য ছিল প্রায় ৩২ কোটি টাকা (৩০টির মোট মূল্য প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা), যা দুই বছর পার হতেই কার্যক্ষমতা হারিয়েছে।

অথচ, বর্তমান টেন্ডার নথিতে একই মানের ইঞ্জিনের প্রতিটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা! অর্থাৎ, ৩০টি ইঞ্জিনের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারদরের তোয়াক্কা না করে এই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের মূল উদ্দেশ্য সুইসব্যাংক কিংবা বেগমপাড়ার মতো নিরাপদ আশ্রয়ে অর্থ পাচার ও বিশাল অঙ্কের কমিশন ভাগাভাগি।

এই মহাপরিকল্পনা ও বিপুল অঙ্কের অনিয়মের বিষয়ে জানতে রেলওয়ের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কেউই নাম প্রকাশ করে বা অফিশিয়ালি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের একজন প্রকৌশলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আগের ৩০টি ইঞ্জিন কিনে রেল এখন ভুগছে। নতুন করে আবারও একই ফাঁদ তৈরি করা মানে রেলওয়েকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া।”