খামারবাড়ির উপ-পরিচালক মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে পলাতক আসামিদের আশ্রয় ও আওয়ামী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের অভিযোগ

ঢাকা খামারবাড়িস্থ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক এ এ মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্য, দুদকের ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামিদের আশ্রয় প্রদান এবং সরকারি গাড়ি-জ্বালানির নজিরবিহীন অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। মহাপরিচালক (ডিজি) মোঃ আব্দুর রহিমের সাথে একই এলাকায় বাড়ি হওয়া এবং মন্ত্রণালয়ের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে বিশেষ সখ্যের সুবাদে তিনি নিজেকে খামারবাড়ির স্বঘোষিত ‘সেকেন্ড ডিজি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে বর্তমানে অধিদপ্তরের সাধারণ ও সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

দুদকের পলাতক আসামিদের আশ্রয় ও পুনর্বাসন:

অনুসন্ধানে জানা যায়, কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় (মামলা নং: সিআর-৯০/২০২২) সাবেক সহকারী পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ শরিফুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে থাকলেও, ২ নং আসামি উচ্চমান সহকারী অলিউল্লাহ প্রধান এবং সাবেক ক্যাশিয়ার মোঃ জাহিদ হাসান গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি হওয়া সত্ত্বেও মাসুম বিল্লাহর ছত্রছায়ায় বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

ঘুষের বিনিময়ে বদলি আদেশ স্থগিত ও জুন ক্লোজিংয়ের টেন্ডার:

গত মে মাসে ক্যাশিয়ার জাহিদ হাসানকে ময়মনসিংহে এবং ক্যাশ সরকার হাবিবুর রহমানকে চাঁদপুরে তাৎক্ষণিক অবমুক্তির (রিলিজ) আদেশ দেওয়া হয়। নতুন ক্যাশিয়ার যোগদান করলেও জাহিদ হাসান তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিয়ে উল্টো ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, ৫ লাখ টাকা এবং ১ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে মাসুম বিল্লাহর কাছ থেকে বদলি আদেশ বাতিলের মৌখিক আশ্বাস পেয়ে তারা আগের আসনেই কাজ করছেন। মূলত জুন মাসের বিল পরিশোধ সংক্রান্ত কয়েক কোটি টাকার টেন্ডার ও কোটেশনের ‘ভাগবাটোয়ারা’ নিশ্চিত করতেই এই পলাতক আসামিদের খামারবাড়িতে রেখে দেওয়া হয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ‘আওয়ামী পুনর্বাসন’:

স্বৈরাচারী সরকার পতনের পর ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে যেসকল দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল, মাসুম বিল্লাহর সিন্ডিকেট মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তাদের পুনরায় ঢাকার লাভজনক পদে ফিরিয়ে আনছে। পদায়ন পেতে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বদলি আদেশ ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করে ব্যাকডেটে সই করে গোপনে প্রার্থীর হাতে হার্ডকপি তুলে দেওয়া হচ্ছে।

ক্যাডার কর্মকর্তাদের সরিয়ে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ:

প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে মাসুম বিল্লাহ একক সিদ্ধান্তে বদলি বাণিজ্য চালাচ্ছেন। বিসিএস (কৃষি) ক্যাডার কর্মকর্তাদের বদলি নিয়ন্ত্রণ করতে চক্রান্তের মাধ্যমে অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন-১) মোঃ হাসানুজ্জামানকে বদলি করান তিনি। এরপর উপপরিচালক (প্রশাসন) হজে যাওয়ার পর তিনি পুরোপুরি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সুবিধাজনক স্থানে পদায়নের নাম করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

সরকারি গাড়ি ও জ্বালানির অপব্যবহার:

নিয়ম অনুযায়ী ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও প্রভাব খাটিয়ে মাসুম বিল্লাহ ফুলটাইম সরকারি বিলাসবহুল গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঠ-১৩-৬১৬৭) গভীর রাত পর্যন্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহার করছেন। তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যেও তিনি মাসে ৪০০ থেকে ৫০০ লিটার সরকারি তেল অপচয় করছেন। এর বিরুদ্ধে কোনো চালক কথা বললে তাকে চাকরিচ্যুত বা বদলির হুমকি দেওয়া হয়।

অতীতের দুর্নীতি ও অদৃশ্য খুঁটির জোর:

পূর্বে পাবনা সদর ও চাটমোহর উপজেলায় কৃষি অফিসার থাকাকালীনও কৃষকের বরাদ্দ লোপাট করে পাবনা জেলা সদরে একটি ৫ তলা বিলাসবহুল ভবনসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিগত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর খামারবাড়ির গেটে তালাবদ্ধ করে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং প্রশাসন ক্যাডারের অফিসারদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের দায়ে গত মার্চে তাকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছিল। তার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হলেও, এক ‘অদৃশ্য শক্তির’ ইশারায় তিনি এখনো খামারবাড়িতেই বহাল রয়েছেন।

সরকারের কৃষি খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই অধিদপ্তরে একজন অতিরিক্ত উপ-পরিচালকের এমন প্রকাশ্য জবরদস্তিমূলক দুর্নীতি এবং আদালতের পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের আশ্রয় দেওয়ার ঘটনাটি সুশাসনের চরম পরিপন্থী। অধিদপ্তরের সচেতন মহল অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মহোদয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও কঠোর আইনি শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।