ব্যর্থতা-বিতর্কের পাহাড়: দুর্নীতি, সিন্ডিকেট ও বিপুল ঘাটতির নেপথ্যে এক ফ্যাসিবাদী সহযোগী এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান

এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান গোটা চাকুরি জীবনে কখনো মনোযোগী হয়ে রাজস্ব আদায় করেননি, আদায়ের কোনো অভিজ্ঞতাই তার ছিল না। অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অব ট্যাক্টেস (এসিটি) ও ডেপুটি কমিশনার অব ট্যাক্সেস (ডিসিটি) পদে কর্মরত সময়ে তিনি বেশিরভাগ কাঁটাবনের ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)-তে সময় কাটাতেন। এরপর তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ে উপ-সচিব হিসেবে যোগ দেন। সচিব হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে কাজ করেননি। পলাতক আওয়ামী সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের কুখ্যাত অর্থ সচিব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থ গভর্নর আবদুর রউফের (তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক) মাধ্যমে তিনি এক জায়গা থেকেই সব পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। এরপর এই ভদ্রলোককে (শেখ রেহানা এবং সালমান এফ রহমান কর্তৃক) ব্যাংকিং বিভাগে সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়। এরপরই আব্দুর রহমান খান সরাসরি তার তত্ত্বাবধানে ও অসৎ আনুগত্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংক ধ্বংস করেন, যার জন্য জাতি এখন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এনবিআর-এ যোগ দেওয়ার পরপরই তিনি অসৎ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন এবং সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ডক্টর সালেহউদ্দিন আহমেদকে ক্রমাগত বিভ্রান্ত করেন। শেষ পর্যন্ত এনবিআর দু’ ভাগ করতে ব্যর্থ হন।

এনবিআর থেকে তার অপসারণের এক দফা দাবিতে সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলনকারী, মেধাবী, সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেছেন এবং অত্যন্ত খ্যাতিমান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি তালিকা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (অঈঈ) গিয়েছিলেন। এর ফলে তিনি বহু সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তার কর্মজীবন ধ্বংস করে দেন এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য এনবিআর-এর অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেন। ফলস্বরূপ, কর ও শুল্ক বিভাগের প্রায় সকল সাধারণ কর্মকর্তা রাজস্ব আদায়ে তাকে অসহযোগিতা করেন এবং অবশেষে স্বাধীনতার পর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এনবিআর ১ লাখ হাজার কোটিরও বেশি (সম্ভবত ১.৩ লাখের বেশি) ঘাটতিসহ চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়।

তার মিষ্টি কথা, প্রতারণাপূর্ণ-খামখেয়ালী পদক্ষেপসমূহ এবং কয়েকজন অসৎ কর্মকর্তা-ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সাথে তার কদর্য সিন্ডিকেট সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে সমস্ত অপকর্মকে আড়াল করে রেখেছে। তিনি ব্যবসায়ী নেতাদের (খ্যাতিমান এফবিবিসিআই এবং চেম্বার নেতাদের নেতৃত্বে) সাথে হওয়া চুক্তিকে (সবচেয়ে সংকটময় সময়ে একটি গভীর বোঝাপড়া) নির্লজ্জভাবে অগ্রাহ্য করেছেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে এনবিআর-এর সার্ভিস ক্যাডার সদস্যদের মনোবল ভেঙে

দিয়েছেন। চেয়ারম্যান পদে টিকে থাকার জন্য শুধু ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো থেকে তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ অবৈধ তহবিল সংগ্রহ করছেন। যার ফলশ্রুতিতে ব্যবসায়ীরা নিয়মিত পাওনা রাজস্ব পরিশোধ করেন না।

যেহেতু তিনি চট্টগ্রামে কলেজ ছাত্র থাকাকালীন একটি দলের সদস্য ছিলেন (তিনি চট্টগ্রামের একটি কলেজ থেকে স্নাতক করেছেন), তার মূল আনুগত্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ ইসলামী গোষ্ঠীর প্রতি এবং এখন তিনি চুপিসারে এনবিআর-এর প্রায়

সমস্ত ট্যাক্স জোন ও কমিশনারেটে একই রাজনৈতিক দলের বিপুল সংখ্যক লোক নিয়োগে সুকৌশলে সহায়তা করছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক!! ২০২৬ সালের ২৯ জুন চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর চুক্তির জন্য তিনি এখনও বিপুল পরিমাণ তহবিল (৫০০ কোটি টাকার বেশি) নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে জোরালো লবিং করছেন।

সিএন্ডএফ লাইসেন্স প্রদানের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে। এনবিআরের অধীনস্থ কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমিকে সেই বিধিমালা অনুসারে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে বারবার বেআইনিভাবে বাধা দিচ্ছেন খোদ এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। কর্মকর্তাদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করতে না পেরে তিনি এবার বেআইনিভাবে পুরো পরীক্ষা প্রক্রিয়াই বন্ধ করে

দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, সিএন্ডএফ লাইসেন্সের লিখিত পরীক্ষার পরপরই এনবিআর চেয়ারম্যান কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির মহাপরিচালকের কাছে ১১০ জনের একটি তালিকা দেন। তিনি দাবি করেন, তালিকাটি সরকারের একজন মন্ত্রীর তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে। এ তালিকার প্রার্থীদের উত্তীর্ণ করাতে না পারলে তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হবে না জানা যায়, গত ১৬ মে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় ২.৫২১ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ২১০ জন উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ওই তালিকায় আরও ১১০ জনকে উত্তীর্ণ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এতে সাড়া না দেওয়ায় লিখিত পরীক্ষার ফলাফল আটকে রাখা হয়। কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিএন্ডএফ) এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২৬ অনুযায়ী, লিখিত পরীক্ষার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফল প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে গত ১ জুন ফল প্রকাশ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ না করার জন্যও একাডেমির মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বিধিমালা অনুযায়ী ২৬ জুনের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকায় গত বুধবার পরীক্ষা কমিটি সময়সূচি প্রকাশ করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির মহাপরিচালকসহ পরীক্ষা কমিটির ছয় সদস্যকে বরখাস্ত করার হুমকি দেন এবং বৃহস্পতিবার ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে পরীক্ষা স্থগিতের আদেশ জারি করেন। যদিও বিধিমালা অনুযায়ী এনবিআরের এ ধরনের ক্ষমতা নেই।

একজন অদক্ষ, দুষ্ট ও বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপক, যিনি এনবিআর-কে নেতৃত্ব দিতে সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান ব্যর্থ হয়েছেন এবং যিনি অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনের একজন সক্রিয় সহযোগী ছিলেন, তিনি পুরো অন্তর্বর্তীকালীন সময় পার করতে পেরেছেন, এমনকি বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ও তার কর্মজীবনও শেষ করতে পেরেছেন!! কিন্তু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রাপ্য তার বিপুল অর্থ এবং কুখ্যাত সিন্ডিকেটের জোরে এখনও নিয়মিত অবসরেও যেতে চান না!! অথচ, অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের প্রায় ৩০ জন সচিবকে যাদের মধ্যে অনেকেই প্রকৃত সৎ, দক্ষ এবং আব্দুর রহমান খানের চেয়ে অনেক ভালো কর্মকর্তা ছিলেন চাকরি ছাড়তে হয়েছে তার কূটকৌশলের জন্যে। আব্দুর রহমান খানের মেয়াদ বাড়ানো হলে তিনি আগামী বছর ঘাটতি এ বছরের তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ বাড়াবেন (হয়তো প্রায় ২.৭৫