
বাংলাদেশে অনুমোদিত বাজাজ (Bajaj) সিএনজি থ্রি-হুইলারের ইঞ্জিন ক্ষমতা যেখানে ১৯৮.৮৮ সিসিতে সীমাবদ্ধ, সেখানে রহস্যজনকভাবে ২৩৬.২ সিসির উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অননুমোদিত সিএনজি অটোরিকশা আমদানি, নিবন্ধন ও বিক্রির ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)-এর নির্দেশনা, মোটরযান আইন এবং হাইকোর্টের রায় উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী চক্র বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে এই সিএনজি বাজারজাত করছে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম ক্ষতির মুখে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—রাজধানীর মগবাজারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হালিমা রশিদ ট্রেডিং এবং এর পেছনের মূল পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত হাজী আব্দুর রশিদ বুলু দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বাজারের জন্য তৈরি ২৩৬.২ সিসির বাজাজ RE মডেলের সিএনজি বাংলাদেশে আমদানি করছে। অভিযোগ রয়েছে, সিসি ও মূল্য কম দেখিয়ে (আন্ডার-ইনভয়েসিং) শুল্ক ফাঁকি, বিআরটিএ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অবৈধ রেজিস্ট্রেশন এবং রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি বিক্রির মাধ্যমে গড়ে উঠেছে শত কোটি টাকার সিন্ডিকেট।
বৈধ বাজার বনাম অবৈধ আমদানির বাস্তবতা
বাংলাদেশে বাজাজ ব্র্যান্ডের অনুমোদিত সিএনজির একমাত্র বৈধ ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করছে রানার অটোমোবাইলস পিএলসি ও উত্তরা মোটরস। রানার গ্রুপ ময়মনসিংহের ভালুকায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক সংযোজন কারখানা গড়ে তুলেছে। ভারত থেকে যন্ত্রাংশ এনে দেশে সিএনজি সংযোজন করা হয়।
খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ১০০টি বৈধ বাজাজ সিএনজি উৎপাদনে ৬ কনটেইনার যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হয়, যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সব ধরনের শুল্ক, ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধ শেষে বাজারে প্রতিটি বৈধ সিএনজির বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।
রানার অটোমোবাইলসের সিএফও সনদ দত্ত বলেন, “২৩৬ সিসির ইঞ্জিনটি মূলত ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য তৈরি। বাংলাদেশে আমদানির জন্য এটি অনুমোদিত নয়। হালিমা রশিদ ট্রেডিং বাজাজের অফিশিয়াল সোর্স থেকে পণ্য আনছে না। এই ধরনের অননুমোদিত আমদানিতে বাজারে বাজাজ ব্র্যান্ডের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
২ বছরে প্রায় ৭ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত হালিমা রশিদ ট্রেডিং মোট ১৭টি চালানে ৭২৫ ইউনিট সিএনজি অটোরিকশা আমদানি করেছে। এসব চালানে সরকারের প্রায় ৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে।
বছরভিত্তিক শুল্ক ফাঁকির হিসাব
২০২৪ সালে ২২ ইউনিট আমদানিতে ফাঁকি প্রায় ২১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা
২০২৫ সালে ২৩৪ ইউনিট আমদানিতে ফাঁকি প্রায় ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা
২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৪৫১ ইউনিট আমদানিতে ফাঁকি প্রায় ৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরেই এই অবৈধ আমদানির পরিমাণ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এক চালানেই ৭৪ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি
চলতি বছরের মার্চে ভারত থেকে ৭২ ইউনিট সিএনজি আমদানি করে হালিমা রশিদ ট্রেডিং। আমদানিপত্রে প্রতি ইউনিটের মূল্য মাত্র ১,৫০০ ডলার ঘোষণা করা হয়। কাস্টমস সেটির শুল্কায়ন মূল্য নির্ধারণ করে ১,৬০০.০৫ ডলার।
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ২৩৬.২ সিসির বাজাজ RE মডেলের প্রকৃত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ছিল প্রতি ইউনিট প্রায় ২,৫০০ ডলার। অর্থাৎ প্রকৃত মূল্য গোপন করে কম দামে ঘোষণা দেওয়ায় কেবল একটি চালানেই সরকারের প্রায় ৭৪ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
বিআরটিএ’র অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর ৩৫.০৩.০০০০.০০৩.৩১.০৩৩.২৪-১৯০২ স্মারকের মাধ্যমে বিআরটিএ পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শীতাংশু শেখ বিশ্বাস “হালিমা রশিদ ট্রেডিংকে” ২২টি বাজাজ RE থ্রি-হুইলারের রেজিস্ট্রেশনের অনুমতি দেয়।
বিআরটিএ’র ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার পরিচালক স্বাক্ষরিত ওই স্মারকে উল্লেখ করা হয়, “বিশেষ বিবেচনায়” ২২টি গাড়ির নিবন্ধনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, যেসব গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষমতা বাংলাদেশে অনুমোদিত নয়, সেগুলো কীভাবে নিবন্ধনের অনুমতি পেল? স্থায়ী টেকনিক্যাল কমিটি কোন ভিত্তিতে এই অনুমোদন দিল? আমদানি পর্যায়ে সিসি যাচাইয়ে কেন কঠোরতা দেখানো হয়নি?
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিআরটিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের যোগসাজশ ছাড়া এই অনুমোদন সম্ভব নয়।
হাইকোর্টের রায় উপেক্ষা করে সিএনজি চলাচল
হাইকোর্টের একটি রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরে বাণিজ্যিকভাবে শুধুমাত্র সবুজ রঙের নিবন্ধিত সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করতে পারবে। ব্যক্তিগত বা প্রাইভেট নিবন্ধন পাওয়া ছাই রঙের সিএনজি বাণিজ্যিকভাবে চলাচলের সুযোগ নেই।
বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৬ সালের একটি রিট খারিজ করে এই অবস্থান বহাল রাখেন। ফলে প্রাইভেট নিবন্ধনধারী সিএনজির বাণিজ্যিক চলাচলের সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করেই দেশের বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার প্রাইভেট সিএনজি বাণিজ্যিকভাবে চলাচল করছে।
রেজিস্ট্রেশন ছাড়া সিএনজি বিক্রি
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, শোরুম বা ডিলারের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে হস্তান্তরের আগেই প্রতিটি মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে বিআরটিএ ২০০৭ ও ২০১৪ সালে পৃথক স্মারকে দেশব্যাপী কঠোর নির্দেশনা জারি করেছিল।
মোটরযান অধ্যাদেশের ১৪০ ধারা অনুযায়ী, রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি বিক্রি বা হস্তান্তর করলে জেল, জরিমানা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিধান রয়েছে।
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাজী আব্দুর রশিদ বুলুর নিয়ন্ত্রিত ডিলার নেটওয়ার্ক রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই দেদারসে সিএনজি বিক্রি করছে।
পুরোনো সিন্ডিকেট, নতুন কৌশল
খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, আব্দুর রশিদ বুলুর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। উত্তরা মোটরসের ডিলারশিপের সময় ২০০১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে সিএনজি প্রতিস্থাপন কার্যক্রমে ব্যাপক দালালি, ঘুষ বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি সিএনজি প্রতিস্থাপনে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হতো।
২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের হলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি তদন্ত থেকে রক্ষা পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিআরটিএ কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও মুন্সিগঞ্জ বিআরটিএ’র কিছু কর্মকর্তার সাথে সিন্ডিকেটের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। তাদের সহযোগিতায় অবৈধভাবে হাজার হাজার সিএনজির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
অবৈধ সম্পদের পাহাড়
শুল্ক ফাঁকি, রেজিস্ট্রেশন বাণিজ্য ও দালালি থেকে অর্জিত অর্থে হাজী আব্দুর রশিদ বুলু রাজধানীর বসুন্ধরা ও ইস্কাটন এলাকায় একাধিক বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এছাড়া বেনামে দেশজুড়ে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্যও পাওয়া গেছে।
তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের দাবি
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, এটি কেবল শুল্ক ফাঁকির ঘটনা নয়; বরং এটি বিআরটিএ, কাস্টমস ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট।
রাজস্ব ক্ষতি রোধ, অবৈধ রেজিস্ট্রেশন বাতিল, জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুদক, এনবিআর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তদন্ত এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।















