বোন, ভাই-ভাবিসহ পারিবারিক মাদক কারবারে সোয়া ৫ কোটি টাকার লেনদেন!

একই পরিবারের বাবা, ৩ মেয়ে, ২ জামাই এবং ১ পুত্রবধূ মোট ৭ জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে আসে, এই পারিবারিক চক্রটি একটি অবৈধ মাদক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল এবং মাদক কারবারের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন করত।

২০০৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ৫ কোটি ১৭ লাখ ২৭ হাজার ৩৭৭ টাকা নিজেদের ব্যাংক হিসাবে লেনদেন করেছে মর্মেও অনুসন্ধানে জানা যায়। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সারা দেশের বিভিন্ন থানায় এক বা একাধিক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

সিআইডি কর্তৃক দায়েরকৃত গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধনী ২০১৫) এর ৪(২) ধারায় মামলায় অভিযুক্তরা হলেন— মো. কামাল উদ্দিন (৩৩), জাহানারা বেগম (৩৩), মো. মানিক মিয়া (৩৬), মো. আ. আওয়াল (৬৫), মোসা. আসমা (৪৩), রেশমা খাতুন (৩৯),লিজা বেগম ওরফে লিপি আক্তার (৩১)।

৫, ৬, ৭ নম্বর অভিযুক্তদের পিতা মো. আব্দুল আওয়াল চাঁদপুরের উত্তর মতলবের সটাকী হলেও মামলায় সব অভিযুক্তদের বর্তমান ঠিকানা গাজীপুর টঙ্গীর মাস্টারবাড়ী, চেরাগআলী।

অভিযুক্ত মোসা. আসমার বিরুদ্ধে ৩টি, রেশমা খাতুনের বিরুদ্ধে ১০টি, লিজা বেগম ওরফে লিপি আক্তারের বিরুদ্ধে ৭টি, মো. মানিক মিয়ার বিরুদ্ধে ৫টি এবং অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও এক বা একাধিক বিভিন্ন মামলা রয়েছে।

সিআইডির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা তথ্যের বরাতে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, তিন বোন মোসা. আসমা, রেশমা খাতুন এবং লিজা বেগম ওরফে লিপি আক্তার গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানাধীন দত্তপাড়া এলাকায় মাদক ব্যবসার একটি সিন্ডিকেটের মূলহোতা হিসেবে পরিচিত। তাদের সঙ্গে পরিবারের অন্যান্য সদস্য পিতা আব্দুল আওয়াল, আসমার স্বামী মানিক মিয়া, লিজা বেগমের স্বামী কামাল উদ্দিন এবং তাদের সহোদর ভাইয়ের স্ত্রী জাহানারা বেগম (ভাবি) সমন্বয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে ওঠে। পারিবারিকভাবে চাঁদপুর জেলার বাসিন্দা হলেও তাদের ৩ বোনের বিভিন্ন জেলাতে বিয়ে হয় এবং সবাই স্বামী, সন্তান ও পিতা-মাতাসহ সবাইকে নিয়ে গাজীপুর টঙ্গী পূর্ব থানাধীন দত্তপাড়া এলাকায় বসবাস করে।

অভিযুক্তরা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৌশলে অবৈধ মাদকদ্রব্য এনে নিজেরা অথবা স্থানীয় বহনকারীদের মাধ্যমে গাজীপুর জেলাসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ ও বিক্রয় করতো। স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে তারা এই কার্যক্রম পরিচালনা করতো। অবৈধ মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের অর্থ তাদের নামে থাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টসমূহে লেনদেন করে মর্মে সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে আসে।

জসীম উদ্দিন খান আরও বলেন, অভিযুক্তদের কোনো বৈধ আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও তাদের ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং মাদক কারবার থেকে অর্জিত অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে তারা মানিলন্ডারিং করেছে। প্রাথমিকভাবে ৭৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকার জমি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। অবশিষ্ট অর্থের একটি অংশ দিয়ে মাদক ক্রয় এবং নিজেদের ভোগ-বিলাসে ব্যয় করা হয়েছে মর্মেও অনুসন্ধানে উঠে আসে।

অনুন্ধানকালীন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মাদক ও অন্যান্য অপরাধের মামলার তথ্য রয়েছে উল্লেখ করে সিআইডির এ বিশেষ পুলিশ সুপার বলেন, রেশমা খাতুনের বিরুদ্ধে জিএমপি’র টঙ্গি ডিএমপির তেজগাঁও ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন থানায় ১০টি মামলা, লিজা বেগম ওরফে লিপি আক্তারের বিরুদ্ধেও টঙ্গী পূর্ব থানা, ডিএমপির তেজগাঁও ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও চট্টগ্রামের রেলওয়ে থানায় ৭টি মামলা, একইভাবে মানিক মিয়ার বিরুদ্ধে ৫টি মামলা, মোসা. আসমার বিরুদ্ধে ৩টি মামলা, আব্দুল আওয়াল ও কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে ১টি করে মামলার তথ্য পাওয়া যায়।

বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, অবৈধ মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবসা মানিলন্ডারিং অপরাধের একটি সম্পৃক্ত অপরাধ। বর্তমানে ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট এই মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদঘাটন, অজ্ঞাত অপর সদস্যদের শনাক্তকরণ ও অন্যান্য আইনানুগ প্রক্রিয়ার স্বার্থে সিআইডির তদন্ত ও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।